‘শুধু মেয়েরা নয়, ওনার প্রতি ছেলেরাও আকৃষ্ট, আমিও তো ওনাকে…’ নিজের ব্যক্তিত্বের সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়!

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যখন কিং লিয়র করার প্রস্তাব পান, তখনই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, সুমন মুখোপাধ্যায় নির্দেশনা দিলে তবেই তিনি এই কাজ করবেন। সেই শর্তেই শুরু হয়েছিল যাত্রা। আগে থেকে পরিচয় থাকলেও তা ছিল নিতান্তই সৌজন্যমূলক, কোনও দিন একসঙ্গে কাজ করা হয়নি। তাই প্রথম দিনের মহড়ায় স্বাভাবিক ভাবেই ছিল কিছুটা দ্বিধা। মিনার্ভা রেপার্টরির এক ঝাঁক তরুণ অভিনেতার সঙ্গে একজন কিংবদন্তি কী ভাবে মানিয়ে নেবেন, সেই প্রশ্ন ঘুরছিল মনে। কিন্তু প্রথম দিনেই সমস্ত আশঙ্কা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যেন নিজেই নেমে এসেছিলেন মাটিতে। তাঁর মধ্যে ধরা পড়েছিল একেবারে শিশুর মতো সরলতা আর নির্ভেজাল শিল্পীসত্তা, যা তরুণদের সঙ্গে মিশে যেতে এক মুহূর্তও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

মহড়া চলাকালীন তাঁর উপস্থিতিতেই আলাদা একটা আকর্ষণ তৈরি হত। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই যেন তাঁর দিকে টান অনুভব করতেন। শুধু ব্যক্তিত্ব নয়, তাঁর কাজ দেখেও মুগ্ধ হতে হত। এত বড় মাপের অভিনেতা হয়েও কোনও রাগ, অহংকার বা টানট্রামের লেশমাত্র ছিল না। বরং নিজের কাজ নিয়েই তিনি ছিলেন বেশি চিন্তিত। বয়সের কারণে কিছুটা ভুলে যাওয়ার ভয় কাজ করত তাঁর মধ্যে, বিশেষ করে রাজা লিয়রের দীর্ঘ সংলাপ নিয়ে। তাই বারবার অনুশীলন, প্রয়োজনে সংলাপের ভাষায় সামান্য পরিবর্তনের প্রস্তাব, সবটাই করতেন অনুমতি নিয়েই।

শুরুতে ভেবেছিলাম, একজন ডামি অভিনেতা নিয়ে কোরিওগ্রাফি করানো হবে, সৌমিত্রবাবু দেখে নেবেন। কিন্তু সে প্রস্তাব তিনি সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেন। বলেছিলেন, যেমন ভাবে যতবার করতে চাইবেন, ততবারই তিনি নিজে করবেন। এই মানসিকতা থেকেই বোঝা যায়, কাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কতটা গভীর ছিল। আরও আশ্চর্যের বিষয়, তরুণ অভিনেতাদের মহড়ার পরে যেভাবে নোট দেওয়া হত, তিনি চেয়েছিলেন সেভাবেই সবার সামনে তাঁকেও নোট দেওয়া হোক। আলাদা কোনও বিশেষ সুবিধা নিতে তিনি রাজি হননি।

পরিচালক হিসেবে বয়সে নবীন হলেও, সেই সম্মান তিনি বরাবরই দিয়েছেন। কখনও কাজের মাঝে হস্তক্ষেপ করেননি। কারও পরামর্শ চাইলে, তা দিতেন পরিচালকের কথা শেষ হওয়ার পরেই। এমনকি পরামর্শ দিয়েও বলতেন, সুমনের সঙ্গে কথা বলে তবেই যেন তা প্রয়োগ করা হয়। এই শালীনতা আর পেশাদারিত্বই তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। নিজের জায়গা জানা, আবার অন্যের জায়গাকেও সম্মান করা, এই গুণ খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়।

আরও পড়ুনঃ ‘আমার জীবনের শেষ দিনেও যেন সিঁথিতে সিঁদুর থাকে’, ভালোবাসার পরিণতির এক বছর পার! মধ্যরাতে তারই উদযাপন! আবেগে ভাসলেন রুবেল-শ্বেতা!

সবশেষে বলতেই হয় তাঁর অমানুষিক পরিশ্রমের কথা। একসঙ্গে যাতায়াত করতে করতে চলত আড্ডা, স্মৃতিচারণ, নাটক নিয়ে আলোচনা। কখনও তাঁকে ক্লান্ত হতে দেখা যায়নি। দুপুরে খাওয়ার পর শুধু আধ ঘণ্টার বিশ্রাম চাইতেন, সেটুকুও অত্যন্ত বিনীতভাবে। কারণ তিনি ছিলেন প্রকৃত শিল্পী, যিনি নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে জানতেন। সেই তাড়নাই তাঁকে শেষ দিন পর্যন্ত কাজের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল।

Back to top button