পরিবারের দায়িত্ব নিতে গিয়ে করেছিলেন আত্মত্যাগ! ভালোবাসাকেও জানিয়েছিলেন বিদায়! ৯৮ বছর বয়সে থেমে গেল সেই কিংবদন্তির পথচলা!

হিন্দি সিনেমার স্বর্ণযুগের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের একজন, বর্ষীয়সী অভিনেত্রী কামিনী কৌশল আর নেই। ৯৮ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণে স্তব্ধ চলচ্চিত্র দুনিয়া। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, শেষ সময়ে শান্ত পরিবেশেই তাঁকে বিদায় জানিয়েছেন স্বজনেরা, এবং পরিবার আপাতত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত থাকতে চান। কয়েক মাস আগেই—২৫ ফেব্রুয়ারি—নিজের ৯৮তম জন্মদিন উদযাপন করেছিলেন তিনি। সেই ঝলমলে হাসির আড়ালে যে এত দ্রুত বিদায় লুকিয়ে ছিল, তা বুঝে ওঠাই যায়নি কারও।
সাত দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত তাঁর কর্মজীবন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়। ১৯৪৬ সালে ‘নীচা নগর’–এর মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন কামিনী, যা প্রথম কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির খেতাব জিতে ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেই ছবির সাফল্যই তাঁর প্রতিভাকে এক নতুন মর্যাদা দেয়। এরপর ‘দো ভাই’, ‘জিদ্দি’, ‘শবনম’, ‘ঝাঁঝালো’, ‘আরজু’, ‘গোদান’—এক এক করে অসংখ্য ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় মুগ্ধ করেন দর্শককে। বয়স বাড়লেও আলো ম্লান হয়নি; বরং চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবেও ‘দো রাস্তে’, ‘প্রেম নগর’, ‘আনহোনি’–র মতো ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এমনকি ‘লাল সিং চাড্ডা’ (২০২২)–তেও তাঁর উপস্থিতি মন কেড়েছিল।
লাহোরে উমা কাশ্যপ নামে জন্ম নেওয়া কামিনী ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা এক পরিবারের সদস্য। বাবা শিবরাম কাশ্যপ ছিলেন খ্যাতনামা উদ্ভিদবিজ্ঞানী। ছোটবেলা থেকেই ঘোড়ায় চড়া, নৃত্য, সাঁতার, কারুশিল্প—বিভিন্ন বিষয়ে তিনি দারুণ দক্ষ ছিলেন। রেডিও নাটক ও থিয়েটার তাঁকে গড়ে তুলেছিল এক পরিণত শিল্পীতে। পরিচালক চেতন আনন্দ তাঁর প্রতিভা চিনেই ‘নীচা নগর’-এর জন্য তাঁকে বেছে নেন এবং পর্দার নাম দেন ‘কামিনী কৌশল’। এরপর দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর, অশোক কুমার, দেব আনন্দসহ বহু কিংবদন্তির সঙ্গে তিনি কাজ করেন। দিলীপ কুমারের সঙ্গে তাঁর অনস্ক্রিন রসায়ন তো আজও স্মরণীয়।
কিন্তু পর্দার আড়ালে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল এক জটিল আবেগমথিত অধ্যায়। ১৯৪৮ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তাঁর বড় বোন। বোনের দুই মেয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে কামিনীর কাঁধে। পরিবার ও পরিস্থিতির চাপে তিনি পরবর্তীতে বোনের স্বামী বি.এস. সুধ–এর সঙ্গেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই সময়েই ‘শহীদ’ ছবির শুটিং চলাকালীন দিলীপ কুমারের সঙ্গে তাঁর গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুই তারকার সেই সম্পর্ক ছিল আন্তরিক, তীব্র এবং একইসঙ্গে বেদনাদায়ক—কারণ দু’জনেই শেষ পর্যন্ত দায়িত্ববোধের কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ ‘দর্শকদের মন ভেঙে দিল রায়ান! নায়ক থেকে এবার খলনায়কে রূপান্তর? কোন দিকে মোড় নিচ্ছে ধারাবাহিকের গল্প?
অবশেষে পারিবারিক অশান্তি এড়াতে ও নিজের দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিতে কামিনী সিদ্ধান্ত নেন সম্পর্কটি এখানেই শেষ করবেন। জীবনের কঠিনতম সেই সিদ্ধান্ত হয়তো তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু শিল্পীরূপে তিনি কখনও হার মানেননি। নিজের কঠোর পরিশ্রম, অসামান্য প্রতিভা আর অবিচল মনোবল দিয়ে তিনি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন অমর নায়িকার আসনে। কামিনী কৌশলের প্রয়াণে তাই শুধু এক অভিনেত্রীকেই নয়, হারাল ভারত তার এক যুগান্তকারী স্মৃতি।

