‘খেতে পেতাম না, প্রতিবেশীর থেকে চাল-ডাল আনতাম!’ ‘আমি তো একটা বর নিয়ে ঘর করি না…’ হাসিমুখের আড়ালে এক কঠিন জীবন সংগ্রাম! অকপটে অভিনেত্রী তনিমা সেন!

বাংলা টেলিভিশন (Bengali Television) এবং চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ তনিমা সেন (Tanima Sen)। গত কয়েক দশক ধরে নিজের অনবদ্য অভিনয় এবং বিশেষ করে কৌতুক অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি বাঙালির ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নিয়েছেন। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় সিরিয়াল থেকে শুরু করে সমসাময়িক চলচ্চিত্র সবক্ষেত্রেই তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর লেখনী শক্তিও সর্বজনবিদিত। কিন্তু রূপালি পর্দার এই হাসিখুশি মানুষের দীর্ঘ কর্মজীবনের পথটি যে মোটেও মসৃণ ছিল না, বরং তা ছিল চড়াই-উতরাইয়ে ভরা, সেই অজানা অধ্যায়ই সম্প্রতি এক পডকাস্টে তুলে ধরলেন তিনি।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে সাফল্যের শিখরে থাকলেও, টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তনিমা সেনের গলায় ঝরে পড়ল একরাশ আক্ষেপ। তিনি জানান, বর্তমানে যেভাবে কাজের বণ্টন বা সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তাতে তাঁর মতো দক্ষ শিল্পীদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির এই বদলে যাওয়া সমীকরণকে তিনি ‘ডার্ক রিয়েলিটি’ বা অন্ধকার বাস্তব হিসেবে অভিহিত করেছেন। নিজের বর্তমান অবস্থাকে একটি কচ্ছপের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, পরিস্থিতির চাপে পড়ে তিনি আজ অনেকটা ধীরগতিতে এগোচ্ছেন, ঠিক যেমন একটি কচ্ছপ প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকে। কাজের এই অভাব তাঁকে মানসিকভাবে কিছুটা ব্যথিত করলেও তিনি হার মানতে রাজি নন।
অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চরম আর্থিক সংকট, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। পডকাস্টে তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, কেরিয়ারের একটি পর্যায়ে যখন হাতে কোনো কাজ ছিল না, তখন তাঁকে বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ঘরে অন্নসংস্থান করার জন্য প্রতিবেশীদের কাছ থেকে চাল-ডাল চেয়ে আনতে হতো। পর্দার আড়ালে থাকা এই চরম দারিদ্র্যের কথা তিনি এতদিন কাউকে জানতে দেননি। আত্মসম্মানবোধ বজায় রাখতে হাসিমুখে সব লড়াই একা লড়েছেন তিনি, যা তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার এক অনন্য নিদর্শন।
আরও পড়ুন: রাজনীতির প্রভাব কাটলেই ফিরবে টলিউডের সোনালী দিন!’ ‘বড্ড বেশি দমবন্ধ লাগছিল, এবার মুক্ত হওয়ার পালা!’ টলিউডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী অভিনেতা! সরকার বদল হতেই মুখ খুললেন চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী
তনিমা সেনের চরিত্রের অন্যতম বড় গুণ হলো তাঁর অদম্য মানসিক শক্তি এবং হাস্যরস। তিনি জানান, জীবনে যখনই বড় কোনো শোক বা কষ্ট এসেছে, তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন সেটিকে হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখতে। তাঁর মতে, নিজের দুঃখের কথা সবার কাছে প্রকাশ করলে অনেক সময় মানুষ তা নিয়ে উপহাস করে বা হিংসে বোধ করে। তাই চরম বিবাদের পর শুটিং ফ্লোরে গিয়েও তিনি অবলীলায় হাস্যরসের অভিনয় করে গেছেন। এই ‘প্রফেশনালিজম’ এবং বাইরের হাসিখুশি অবয়ব দেখে অনেকেই ভুল করে ভাবেন যে তাঁর জীবনে কোনো দুঃখ নেই, অথচ পর্দার আড়ালের গল্পটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তানিমা সেন জানান, অভিনয়ের চেয়ে এখন তিনি তাঁর লেখনী নিয়ে বেশি সময় কাটাতে চান। তিনি মনে করেন, অভিনয়ের সুযোগ এখন সীমিত হয়ে আসছে, তাই নিজের সৃজনশীলতাকে তিনি লেখার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে চান। শারীরিক অসুস্থতা এবং মানসিক ক্লান্তি দূর করতে তিনি কিছুটা সময় নির্জনে কাটাতে এবং কোথাও ঘুরে আসতে ইচ্ছুক। জীবনের এই অপরাহ্ণে দাঁড়িয়েও তনিমা সেনের এই লড়াই এবং সাহসিকতা আগামী প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। এক দীর্ঘ আড্ডার মধ্য দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, গ্ল্যামার দুনিয়ার জাঁকজমকের আড়ালে এক কঠোর লড়াইয়ের ইতিহাস লুকিয়ে থাকে।

