‘কাজ দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে, কেড়ে নেওয়ার অধিকার নেই! এতদিন হয়ে এসেছে কিন্তু এবার…’ টলিউডের অলিখিত ‘ব্যান কালচার’ নিয়ে কী বললেন অভিনেতা সাহেব ভট্টাচার্য!

বাংলা চলচ্চিত্র (Tollywood) ও দূরদর্শনের জগতের একজন অত্যন্ত সুপরিচিত, প্রতিভাবান এবং মার্জিত অভিনেতা হলেন সাহেব ভট্টাচার্য। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চরিত্র ‘ফেলুদা’র তোপসে হিসেবে সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় অভিনয় করে তিনি বাঙালি দর্শকের হৃদয়ে এক স্থায়ী আসন তৈরি করে নিয়েছেন। ‘গোরস্থানে সাবধান’, ‘রয়্যাল বেঙ্গল রহস্য’ বা ‘ডবল ফেলুদা’র মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছে। শুধু গোয়েন্দা গল্পেই নয়, ‘ইচ্ছে’, ‘চট্টগ্রাম’ কিংবা ‘হাট্টিমাটিম’ এর মতো বিভিন্ন ঘরানার চলচ্চিত্র এবং ছোট পর্দার জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ও ধারাবাহিকে নিজের সাবলীল অভিনয়ের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি ক্রীড়াজগৎ এবং সামাজিক বিভিন্ন বিষয়েও তিনি সবসময় যুক্ত থাকেন এবং ইন্ডাস্ট্রির একজন স্পষ্টবাদী ও প্রগতিশীল সদস্য হিসেবে যেকোনো জরুরি ইস্যুতে নিজের যৌক্তিক মতামত তুলে ধরেন।

সম্প্রতি বর্তমান ডিজিটাল মঞ্চে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে টলিউডের এই অভিনেতা বিনোদন জগতের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিতর্কিত বিষয় নিয়ে মুখ খুলেছেন, যা হলো ‘ব্যান কালচার’ বা বয়কট করার প্রবণতা। গত কয়েক বছরে বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে বিভিন্ন কারণে একাধিক শিল্পী, কলাকুশলী বা টেকনিশিয়ানদের কাজ থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ বা বয়কট করার এক অলিখিত নিয়ম তৈরি হয়েছিল, যা নিয়ে অন্দরে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। সাহেব অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এই ‘ব্যান কালচার’ বা নিষিদ্ধকরণের সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই ধরণের মানসিকতা কি এবার সত্যিই বদলে যাওয়ার সময় আসেনি?

শিল্পীদের রুজি-রুটির প্রশ্নে সাহেব ভট্টাচার্য যে বক্তব্য পেশ করেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, যদি আমরা কাউকে কর্মসংস্থান বা নতুন কাজ দিতে না পারি, তবে অন্য কারও কাজ কেড়ে নেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার আমাদের নেই। বিনোদন জগতে একজন টেকনিশিয়ান বা সাধারণ কলাকুশলী দৈনিক পারিশ্রমিকের ওপর ভিত্তি করে সংসার চালান। সেখানে কোনো রকম ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক রেষারেষির কারণে কাউকে যদি কাজ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে তা কেবল একজন ব্যক্তির অধিকার হরণ করে না, বরং তাঁর গোটা পরিবারকে এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। সাহেবের মতে, কাজের অধিকার সবার আগে সুরক্ষিত হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন: একদিকে পুজোর ছবির প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ততা! এর মাঝেই মুখে চোট পেলেন শুভশ্রী! কিভাবে ঘটলো এই দুর্ঘটনা?

ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অভিনেতা আরও একটি অপ্রিয় ও কঠোর সত্যকে সামনে এনেছেন। তিনি দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করেছেন যে, বিগত সময়ে টলিউডের অন্দরে একটা ভয়ের ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, এবং এই ধ্রুব সত্যটাকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা বা উপায় আজ আর নেই। শিল্পী এবং কলাকুশলীদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ বা কাজ করার ক্ষেত্রে যে একটা অদৃশ্য চাপ কাজ করত, তা বিনোদন জগতের সামগ্রিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে উঠে সবাই যেন মুক্তভাবে এবং কোনো রকম মানসিক চাপ বা বাধা ছাড়াই নিজেদের সেরা কাজটা উপহার দিতে পারেন, সেটাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শেষে, সাহেব ভট্টাচার্য আগামী দিনের টলিউডকে কেন্দ্র করে এক পজিটিভ বা ইতিবাচক আশার আলো দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, সমস্ত বৈরিতা ও পরিস্থিতির মধ্যেও সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়মিত কাজ হওয়া এবং কাজের সংখ্যা আরও বাড়ানো, যাতে সিনেমা ও সিরিয়ালের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষের ঘরে অন্ন সংস্থান নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী দিনে টলিউডের নির্মাতারা যেন সমস্ত ভয় কাটিয়ে উঠে বিভিন্ন নতুন গল্প, সমসাময়িক সামাজিক ঘটনা এবং সাহসী বিষয়বস্তু নিয়ে নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে সিনেমা তৈরি করতে পারেন। শিল্পের স্বাধীনতা এবং কাজের মুক্ত পরিবেশ ফিরে আসলেই যে বাংলা সিনেমার প্রকৃত সুদিন আসবে, সেই বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে তাঁর এই বক্তব্যে।

Back to top button