ঝুলিতে ৫০টিরও বেশি সিনেমা! তবলাতেও ছিল দারুণ দখল! তবুও পাননি প্রাপ্য সম্মান! প্রচারের আলোয় আসার আগেই বিদায় নিয়েছেন মনু মুখোপাধ্যায়! রইলো অভিনেতার জীবনের কিছু অজানা কাহিনী!

বাঙালি সিনেমা প্রেমীদের কাছে ‘জয় বাবা ফেলোনাথ’ ছবির সেই রহস্যময় ‘মাছ বাবা’ কিংবা ‘পাতালঘর’ চলচ্চিত্রের অদ্ভুত স্বভাবের ‘গোবিন্দ বিশ্বাস’ চরিত্রটি চিরকাল অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পর্দায় এই চরিত্রগুলোকে যিনি জীবন্ত করে তুলেছিলেন, তিনি আর কেউ নন আমাদের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় অভিনেতা মনু মুখোপাধ্যায় (Manu Mukherjee)। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে নিজের অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা দিয়ে তিনি বাঙালিকে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন এবং মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, ৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করার পরও এই গুণী শিল্পী আজীবন থেকে গেছেন প্রচারের আলোর বাইরে, রুপালী পর্দার অন্তরালে।
খুব কম মানুষই জানেন যে, অভিনয় জগতে মনু মুখার্জী নামে পরিচিতি পেলেও তাঁর আসল নাম ছিল সৌরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৯৩০ সালের ১লা মার্চ কলকাতায় এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মনের ভেতর লুকিয়ে ছিল অভিনয়ের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা। শৈশবে পাড়ার ক্লাবের নাটকে মেয়েদের চরিত্র সেজে প্রথম অভিনয়ের হাতেখড়ি হয় তাঁর। এরপর ১৯৫৭ সালে শ্রীঙ্গন থিয়েটারে একজন সাধারণ ‘প্রমটার’ হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে কলকাতার বিখ্যাত সব মঞ্চ কাঁপিয়ে অভিনয় করেন এবং থিয়েটার জগতে দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
সিনেমার রূপালী পর্দায় মনু মুখোপাধ্যায়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৯ সালে বিশ্বখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেনের ‘নীল আকাশের নিচে’ ছবির মাধ্যমে। এরপর আর তাঁকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সত্যজিৎ রায়, তরুণ মজুমদার, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেনের মতো ভারতীয় চলচ্চিত্রের দিকপাল পরিচালকদের সঙ্গে তিনি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। ‘অশনি সংকেত’, ‘মৃগয়া’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘সাহেব’ এর মতো একের পর এক কালজয়ী সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছে। এমনকি ‘সিটি অফ জয়’ নামক একটি আন্তর্জাতিক ইংরেজি সিনেমাতেও তিনি তাঁর অভিনয়ের ছাপ রেখেছিলেন। শুধু অভিনয়ই নয়, তিনি একজন চমৎকার তবলাবাদকও ছিলেন।
এত বড় মাপের একজন অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ক্যারিয়ারে একটা মস্ত বড় আক্ষেপ থেকে গেছে। সিনেমার পরিচালক বা প্রযোজকরা তাঁকে অভিনয়ের দারুণ সুযোগ দিলেও, কখনোই কোনো ছবিতে প্রধান বা মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ দেননি। সমসাময়িক অন্যান্য অভিনেতারা যেখানে রাতারাতি তারকাখ্যাতি ও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, সেখানে মনু মুখোপাধ্যায় সবসময়ই থেকে গেছেন ‘পার্শ্ব অভিনেতা’ হিসেবে অবহেলিত। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে প্রতিনিয়ত ভেঙেছেন এবং নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিনয় করে গেছেন। ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘টেলি একাডেমী সম্মান’ দিলেও, তাঁর প্রাপ্য মূল্যায়ন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি দিতে পারেনি বলেই মনে করেন অনেকে।
আরও পড়ুনঃ শুটিং সেটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা! সিলিন্ডার ফেটে প্রাণ হারালেন এক টেকনিশিয়ান! বন্ধ হলো শুটিং!
জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা এবং হৃদরোগে ভুগছিলেন। তাঁর একটি শেষ ইচ্ছা ছিল তিনি অন্তত ১০০ বছর বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিধাতার আমন্ত্রণে ২০২০ সালের ৬ই ডিসেম্বর ৯০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তাঁর সেই ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের সিনেমা সব জায়গাতেই তিনি নিজের অভিনয়ের গভীর ছাপ রেখে গেছেন। একজন প্রচারহীন এবং আড়ালে থাকা মানুষ হিসেবে তিনি চলে গেলেও, তাঁর সৃষ্টি ও অভিনয় সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তাঁকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

