‘আমি তো এক বাতিল অভিনেতা!’ ‘নিজের নামের পাশে নিজেই ফুলস্টপ বসিয়েছি!’ এক বুক আক্ষেপ নিয়ে টলিউডের না বলা সত্যি ফাঁ’স করলেন দেবাশিস গাঙ্গুলী!

টলিউড (Tollywood) তথা বাংলা বিনোদন জগতের একজন অত্যন্ত পরিচিত এবং স্বতন্ত্র অভিনেতা হলেন দেবাশিস গাঙ্গুলী (Debasish Ganguly)। সাধারণত স্থূলকায় চেহারা এবং গভীর কালো ঘন ভ্রু-জোড়ার কারণে তিনি দর্শকদের কাছে খুব সহজেই পরিচিতি পেয়েছেন। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে পরবর্তী দুই দশকে বাংলা সিনেমার জগতে অসংখ্য জনপ্রিয় ছবিতে তাঁকে দেখা গিয়েছে। বিশেষ করে সুপারস্টার জিৎ-এর অভিনীত ‘সাথীহারা’, ‘১০০% লাভ’ বা ‘সুলতান’-এর মতো বাণিজ্যিক ধারার ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে দাগ কেটেছে। দেবাশিস গাঙ্গুলী প্রধানত কমেডিয়ান বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেলেও, তাঁর কাজের পরিধি মঞ্চ থেকে পর্দা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসা তাঁর জীবনের না বলা কথাগুলো বিনোদন প্রেমীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাক্ষাৎকারে অভিনেতা তাঁর জীবনের শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন। দেবাশিস বাবু জানান যে, তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়ের নাটকের দল ‘লোবৃষ্টি’র মাধ্যমে। সেখান থেকেই তাঁর দক্ষতার হাতেখড়ি হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি দূরদর্শনের ‘বাংলার ডাকাত’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে পর্দায় পরিচিতি পান। অভিনেতা ভিডিওতে স্বীকার করেছেন যে, তিনি কখনো নিজেকে অনেক বড় মাপের শিল্পী হিসেবে দাবি করেননি, বরং নিজেকে একজন গড়পড়তা বা এভারেজ অভিনেতা বলতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে মঞ্চের সেই দিনগুলো এবং অভিনয়ের প্রতি তাঁর নিষ্ঠাই তাঁকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সাহায্য করেছে।
ভিডিওর একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল অভিনেতার চেহারা ও রূপ নিয়ে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কথা। দেবাশিস গাঙ্গুলী জানান যে, তাঁর পুরু ভ্রু এবং শারীরিক গঠনের জন্য তাঁকে বিভিন্ন সময় সহকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বিদ্রূপের শিকার হতে হয়েছে। এমনকি জনসমক্ষেও তাঁকে নিয়ে অনেকে মজা করতেন। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, তিনি কখনো নিজের চেহারা বা স্টাইল পরিবর্তনের চেষ্টা করেননি। তিনি মনে করেন, যে রূপে তাঁর বাবা-মা তাঁকে ভালোবেসেছেন, সেই রূপ নিয়ে তিনি গর্বিত। এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যই এক সময় টলিউডের ডিরেক্টরদের কাছে তাঁর ‘ইউএসবি’ হয়ে উঠেছিল, যার ফলে তিনি একের পর এক বাণিজ্যিক ছবিতে কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ বিরাট দুঃসংবাদ! শুটিং সেটেই হঠাৎ অসুস্থ সুদীপ সরকার! হাসপাতালে ভর্তি অভিনেতা! এখন কেমন আছেন তিনি?
সাক্ষাৎকারে দেবাশিস গাঙ্গুলীর বিনয়ী ও আক্ষেপহীন মানসিকতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বড় বড় প্রোডাকশন হাউসের সাথে যোগাযোগ রাখা বা আগ বাড়িয়ে কাজ চাওয়ার যে অলিখিত নিয়ম ইন্ডাস্ট্রিতে আছে, সেটি তিনি কোনোদিন রপ্ত করতে পারেননি। কোনো সুপারস্টারের সাথে কাজ করার পরও পরবর্তী সময়ে সেই সখ্যতা বজায় রাখা বা ফোন নম্বর চেয়ে নেওয়া তাঁর ব্যক্তিত্বের সাথে মেলেনি। তিনি নিজেকে কিছুটা ‘বাতিল অভিনেতা’ বা ‘প্রাক্তন অভিনেতা’ হিসেবে সম্বোধন করলেও এর পেছনে কোনো ক্ষোভ বা আক্ষেপ পোষণ করেননি। বরং বর্তমান সময়ের অনেক দক্ষ অভিনেতার ভিড়ে তিনি যে একসময় কাজ করেছেন এবং ভালোবাসা পেয়েছেন, তাতেই তিনি তৃপ্ত।
অভিনেতার গল্প যা যে কোনো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার। তিনি জানিয়েছেন যে, এখন আর বড় ব্যানার বা নতুন কাজের পেছনে তিনি ছোটেন না; বরং নিজের ছোট ফ্ল্যাটে শান্তিতে থাকতেই তিনি বেশি ভালোবাসেন। অভিনেতা মনে করেন, প্রত্যেকের জীবনেই কিছু প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি থাকে এবং সেই দুঃখগুলো নিজের অন্তরে গোপন রাখাই শ্রেয়। সাক্ষাৎকারের শেষে তাঁর গাওয়া গানটির পঙ্ক্তি “যা চেয়েছি কেন তা পাই না, যা পেয়েছি কেন তা চাই না” যেন তাঁর দীর্ঘ অভিনয়ের যাত্রাপথ এবং ব্যক্তিগত জীবনের এক নিগূঢ় সত্যকে তুলে ধরে। সব মিলিয়ে, দেবাশিস গাঙ্গুলীর এই জবানবন্দি গ্ল্যামার জগতের আড়ালে থাকা এক অভিমানী অথচ স্থিতধী শিল্পীর চিত্র ফুটে তুলেছে।

