‘আমি অভিনেত্রী, বে’শ্যা নই!’ ‘ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, তুই তো সুন্দরী নোস…’ ‘চাইলে সারা রাত…!’ শুরুটা ছিল ভীষণ কঠিন! এখনও থামেনি লড়াই! নিজের জীবন সংগ্রাম নিয়ে অকপটে ছন্দা চ্যাটার্জী!

বাংলা বিনোদন দুনিয়ায় যখনই কোনো প্রবীণ ও প্রতিভাবান অভিনেত্রীর নাম উঠে আসে, যিনি যুগের পর যুগ ধরে মঞ্চ, পর্দা এবং যাত্রার আসর মাতিয়ে রেখেছেন তখনই ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের (Chhanda Chatterjee) নাম অবধারিতভাবে প্রথম সারিতে চলে আসে। সম্প্রতি এক বিশেষ পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে ধরা দিলেন এই প্রবীণ শিল্পী। বর্তমানে ছিয়াত্তর বছর বয়সী এই অভিনেত্রী জীবনের ৭১টি বছরই উৎসর্গ করেছেন অভিনয় জগতের চরণে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে কোলঘাটের মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই মহাকাব্যিক পথচলা আজও একইভাবে বহমান। জমিদার পরিবারের রক্ষণশীল গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর এই সুদীর্ঘ লড়াই এবং অভিনয়ের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক পরম অনুপ্রেরণা। এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর জীবনের এমন কিছু অজানা অধ্যায় ও কিংবদন্তিদের স্মৃতি হাতড়েছেন, যা বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল হয়ে রইল।
উক্ত সাক্ষাৎকারে ছন্দা দেবী অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছেন বাংলা থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বদের, যাঁদের হাত ধরে তাঁর অভিনয় জীবনের ভিত তৈরি হয়েছিল। নাট্যজগতের দিকপাল উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভু মিত্র এবং বিজন ভট্টাচার্যের মতো প্রবাদপ্রতিম মানুষদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে উৎপল দত্তের নাট্যদল ‘পিএলটি’-তে কাজ করার সময়কার কঠোর নিয়মানুবর্তিতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, কীভাবে নাটকের চিত্রনাট্য পড়ার সময় প্রতিটি চরিত্রের মুভমেন্ট নম্বর ধরে খাতায় নোট করতে হতো। সংলাপ উচ্চারণ, ফুল স্টপ কিংবা জিজ্ঞাসাসূচক চিহ্নের নিখুঁত প্রয়োগ কীভাবে নাট্যগুরুরা হাতে-কলমে শিখিয়েছিলেন, তা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন প্রবীণ এই অভিনেত্রী। অজিতেশ বাবুর সাথে যাত্রার কাজ কিংবা রেডিও নাটকের সোনালী দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই গুরুদের ছত্রছায়াতেই তাঁর অভিনয়ের বহুমুখী প্রতিভা বিকশিত হয়েছিল।
মঞ্চ নাটকের পাশাপাশি ছন্দা চট্টোপাধ্যায়ের ক্যারিয়ারের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘যাত্রা’ মাধ্যম। সাক্ষাৎকারের এক বড় অংশ জুড়ে ছিল তাঁর যাত্রাশিল্পের কঠিন কিন্তু রোমাঞ্চকর দিনগুলোর কথা। প্রবুদ্ধ বন্ধু অধিকারী, বেলা সরকার, বিনা দেবীদের মতো তৎকালীন যাত্রা জগতের তারকাদের সাথে তাঁর গভীর বন্ধুত্বের কথা উঠে আসে এই আড্ডায়। ‘রক্ত স্বর্ণ লঙ্কা’, ‘লাইলি মজনু’ কিংবা ‘সাগরিকা’র মতো জনপ্রিয় যাত্রাপালায় তাঁর অভিনয় একসময় গ্রাম-বাংলার মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। ‘রক্ত স্বর্ণ লঙ্কা’ পালায় জীবন্ত সাপের সাথে অভিনয়ের সেই হাড়হিম করা অভিজ্ঞতার কথা তিনি বিস্তারিতভাবে জানান।মাইক্রোফোন ছাড়া খোলা গলায় এবং পরবর্তীকালে সেন্টার মাইকের সাহায্যে কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মাইলের পর মাইল পথ পেরিয়ে গ্রামগঞ্জে অভিনয় করে গেছেন এবং কীভাবে তাঁর স্বামী তাঁকে এই দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রাপথে নিঃশর্ত সমর্থন জুগিয়েছেন, সেইসব ব্যক্তিগত যাপনের কথাও তিনি অকপটে তুলে ধরেন।
ছন্দা দেবীর এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর গান ও সংলাপের লাইভ পারফরম্যান্স। স্মৃতির সরণি বেয়ে তিনি শুধু মুখের কথায় অতীতকে তুলে আনেননি, বরং পডকাস্টের মাঝে মাঝেই গেয়ে উঠেছেন কালজয়ী সব যাত্রার গান ও নাটকের সংলাপ। প্রখ্যাত সুরকার ভূপেন হাজারিকার সুরে গাওয়া ‘কাল নাগিনী’ পালার গান “ঘুমা ঘুমা চুপ করে কাল নাগিনী…” কিংবা দেবী গর্জন নাটকের সেই জোরালো সংলাপ যখন ছিয়াত্তর বছর বয়সেও তাঁর কণ্ঠে একই তীব্রতায় ধ্বনিত হয়, তখন তা শ্রোতাদের গায়ে কাঁটা দেয়। দীর্ঘ ৭০ বছরেরও বেশি সময় আগের মুখস্থ করা সংলাপ এবং গানের সুর যেভাবে আজও তাঁর স্মৃতিশক্তিতে অবিকল রয়ে গেছে, তা এক কথায় বিস্ময়কর। ছন্দা দেবী হাসিমুখে জানান, গানের এক বিশাল স্টক রয়েছে তাঁর ঝুলিতে এবং তিনি চাইলে সারা রাত ধরে গান গেয়ে আসর জমিয়ে রাখতে পারেন, যা তাঁর অদম্য জীবনীশক্তিরই পরিচয় দেয়।
আরও পড়ুনঃ ‘নতুন সরকারের কাছে পৌঁছাতে ওই রুদ্রনীলের প্রয়োজন নেই আমার…’ ‘চাল-ডাল-নুন গেলে শিল্প কেন যাবে না?’ দুই বাংলার কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা! তবুও আশাবাদী কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়!
পডকাস্টের শেষাংশে এসে এই প্রবীণ অভিনেত্রী নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে তাঁর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। আজকের তরুণ ছেলেমেয়েদের অত্যন্ত প্রতিভাবান ও সুন্দর অভিনেতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি তাঁদের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ বার্তাও দিয়েছেন। ছন্দা দেবীর মতে, অভিনয় শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলা নয়, এর জন্য প্রয়োজন গভীর চর্চা ও প্রতিনিয়ত কাজ দেখা। নতুনদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ, বেশি বেশি করে গ্রুপ থিয়েটারের নাটক দেখতে হবে এবং বিভিন্ন নাট্যশালার কর্মশালা বা ওয়ার্কশপে অংশ নিতে হবে। কলকাতা থেকে শুরু করে বালুরঘাট, কোচবিহারের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের নাট্যচর্চাকে কাছ থেকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ক্যারিয়ারে কোনো বিশেষ চরিত্র না পাওয়ার আক্ষেপ বা হতাশা তাঁর মনে বিন্দুমাত্র নেই; বরং তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যতদিন দেহে প্রাণ থাকবে এবং শরীর সুস্থ থাকবে, ততদিন তিনি মঞ্চ ও ক্যামেরার সামনে অভিনয় করে যেতে চান কারণ অভিনয়ই তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ।

