সত্যজিৎ রায়ের “দ্যা গ্রেট সত্যজিৎ” হওয়ার পথে ঢাল হয়ে ছিলেন স্ত্রী বিজয়া! “রায় দিবসে” রইলো রায় বাবু আর তার পত্নীর পথ চলার গল্প

১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু তাঁর পৈত্রিক নিবাস কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসুয়া গ্রামে। তিনি ছিলেন বিখ্যাত লেখক, চিত্রকর ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নাতি এবং বাংলা সাহিত্যের জনক সুকুমার রায়ের ছেলে। ভারতীয় চলচ্চিত্র তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম সত্যজিৎ রায়। তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ জন্মায় ১৯৪৯ সালে ফ্রেন্স পরিচালক জঁ রনোয়ার সাথে পরিচয়ের পর এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দি বাইসাইকেল থিফ’ দেখার পর। জঁ রনোয়ার মূলত ‘দি রিভার’ চলচ্চিত্রের শ্যুটিংয়ের জন্য কলকাতায় আসেন এবং সেখানে তাঁর সাথে সত্যজিতের পরিচয় হয়। ঐ সময়ই সত্যজিৎ রনোয়ারের সাথে ‘পথের পাঁচালী’র চলচ্চিত্রায়ণ নিয়ে কথা বলেন এবং রনোয়ার এ ব্যাপারে তাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম ছবি ‘পথের পাচালি’ – যা সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে পরিগনিত হয়। ছবিটি ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে যার মধ্যে অন্যতম হল কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বেস্ট ডকুমেন্টরি ফিল্ম’ অর্জন।
সত্যজিতের নির্দেশনার প্রকৃতি অভিনেতার প্রতিভা ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করত। উৎপল দত্তের মত অভিনেতাদের তেমন কোন নির্দেশনাই তিনি দেননি, অন্যদিকে অপু চরিত্রে সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়কে কিংবা অপর্ণা চরিত্রে শর্মিলা ঠাকুরকে তিনি অনেকটা “পুতুলের” মত ব্যবহার করেছেন। তার শ্রেষ্ঠ কিছু কাজের মধ্যে রয়েছে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘অপু ট্রিলোজি’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন’, ‘অরন্যের দিনরাত্রি’, ‘দেবী’সহ আরো অনেক। ৩২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় পান ‘বিবিসির শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ (১৩তম) উপাধি। পাশাপাশি, পদ্মভূষণ ও ভারতরত্ন পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। বাংলা সাহিত্যের ও চলচ্চিত্র জগতের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই কিংবদন্তির আজ ৯৯তম জন্মদিন। তাকে জানাই জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
১৯২১ সালের এই দিনে জন্মেছিলেন সত্যজিৎ রায়। বাংলা চলচ্চিত্রের এই দিকপাল সগর্বে উচ্চারিত হবেন দিকে দিকে। কিন্তু তাঁর মানিক থেকে সত্যজিৎ হয়ে ওঠার পেছনে সেই ‘ছায়াসঙ্গী’ বিজয়া রায়কেও স্মরণ করা যাক খানিকটা। সৃজনশীল মানুষ হিসেবে কাজেই আজীবন ডুবে ছিলেন সত্যজিৎ রায়। এর বাইরে রায় পরিবার, চলচ্চিত্র ব্যবস্থাপনা, সংসার চালানো, টাকাপয়সা—সব দুহাতে সামলেছেন বিজয়া। প্রথম ছবির নায়ক ‘অপু’কে খুঁজে বের করেছিলেন বিজয়াই।
নিজের থেকে বয়সে ছোট পিসতুতো ভাই’কে ভালবেসে বিয়ে করতেও পিছপা হননি তিনি। পঞ্চাশের দশকে দাঁড়িয়ে এমন কাজ করতে কিন্তু বুকের পাটা লাগে । কিন্তু তাঁর নামও বিজয়া রায় । একদিকে প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব, অন্যদিকে অপার সমর্পণ, একদিকে প্রবল প্রতিভা, অন্যদিকে অসীম ত্যাগ, একদিকে মমতা ঢালা হৃদয়ে করুণার সাগর, উল্টোদিকে অসম্ভব স্পষ্টবক্তা… মিঠে-কড়ায় তাঁর চরিত্র হয়ে উঠেছিল অনন্ত সুন্দর । যাঁর প্রেমে না পড়ে ছাড় পাননি স্বয়ং সত্যজিৎও ।
এ যেনো এক বিপ্লব। হ্যাঁ বিপ্লবই তো। ‘ঘরে বাইরে’ সেই বিপ্লবের প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন নিজেদের ‘পথের পাঁচালি’তেও । বাঙালির শ্রেষ্ঠ চিত্র পরিচালক হয়ে একদিকে যেমন জয় করেছেন গোটা বিশ্ব, অন্যদিকে বিপ্লবের বীজ পুঁতেছিলেন ঘরকন্নার ছোট্ট পরিসর থেকেই । আর সেই ঘরকন্নাকে যিনি সব দিক দিয়ে সফল করেছিলেন, তিনি আর কেউ নন, সত্যজিৎ জায়া, প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তির যোগ্য সহধর্মিনী বিজয়া রায় । যথার্থ অর্থেই মাণিকের অর্ধাঙ্গিনী ছিলেন মঙ্কু । সে পথের পাঁচালির শ্যুটিং টাকার অভাবে আটকে যাওয়ার পর গায়ের গয়না খুলে দেওয়াই হোক, আর কিশোর কুমারকে রবীন্দ্র সঙ্গীত রেকর্ড করে পাঠানোই হোক বা অপুর সংসারের জন্য শর্মিলা ঠাকুরকে স্বামীর মনের মতো অপর্ণায় পরিণত করাই হোক । সারাটা জীবন ধরে স্বামীর প্রতিটি তালে-বোলে-ঠুমরিতে যথাযথ সঙ্গত করে যিনি মহান ওই মানুষটির জ্যোতি আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনি বিজয়া রায় ।

