‘রাহুলের মৃ’ত্যুর ড্রোন ফুটেজ পাবলিক করাটা ঠিক হয়নি…’ ‘মেপে মেপে সরি বলুন, না হলে শুটিং লক!’ অর্ক গাঙ্গুলীর বিস্ফোরক মন্তব্যে তোলপাড় টলিপাড়া!

টলিউড (Tollywood) অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) মর্মান্তিক মৃত্যুর পর থেকেই ওলটপালট হয়ে গেছে বাংলা বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির চেনা সমীকরণ। আর্টিস্ট ফোরামের কর্মবিরতি এবং একাধিক প্রযোজনা সংস্থার কাজ বয়কটের ডাকে যখন টলিপাড়ায় চরম অচলাবস্থা, ঠিক তখনই যেন বারুদে অগ্নিসংযোগ করলেন বিশিষ্ট লেখিকা ও প্রযোজক লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র তথা ‘অর্গানিক স্টুডিওজ’-এর কর্ণধার অর্ক গাঙ্গুলী। সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টলিউডের অন্দরের সিন্ডিকেট রাজ, ক্ষমতা প্রদর্শন এবং নোংরা রাজনীতি নিয়ে যেভাবে তিনি মুখ খুলেছেন, তা নিয়ে এখন তোলপাড় গোটা বিনোদন দুনিয়া। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর অর্কর এই নির্ভীক ও বিস্ফোরক বয়ান টলিউডের ক্ষমতাশালী সংগঠনগুলোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
সাক্ষাৎকারে অর্ক গাঙ্গুলীর করা সবচেয়ে বিতর্কিত এবং চাঞ্চল্যকর মন্তব্যটি ছিল ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। টলিউডের ব্যাকস্টেজ রাজনীতি ও একাধিপত্যের তীব্র সমালোচনা করে সরাসরি ‘তোলাবাজি’র মতো মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন তিনি। অর্ক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “স্বরূপ বিশ্বাস যেটা করেছেন সেটা তো খুবই ক্ষতিকর ইন্ডাস্ট্রির জন্য…পাতি বাংলা ভাষায় হয়তো এটাকে তোলাবাজি বলে।” তাঁর দাবি, ইন্ডাস্ট্রির কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থে পুরো ব্যবস্থাটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। শুধু তাই নয়, রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি অত্যন্ত বিতর্কিত একটি মন্তব্য করেন। অর্ক বলেন, “সরকার বদলের পরে হয়তো এখন এনভারনমেন্ট ইজ ইজিয়ার যে একটু আরো সত্যি কথাগুলো বলা যায়।” তাঁর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, এতদিন টলিপাড়ার একাংশ একপ্রকার ভয়ের পরিবেশের মধ্যে কাজ করছিল, যা রাজনৈতিক হাওয়া বদলাতেই সামনে আসতে শুরু করেছে।
ইন্ডাস্ট্রির কাজের পরিবেশকে ‘অরাজকতা’র সঙ্গে তুলনা করে অর্ক জানান, কীভাবে নিয়মের নামে প্রযোজক ও কলাকুশলীদের হেনস্থা করা হতো। সামান্য কারণে বারবার শুটিং বন্ধ করে দেওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি কোথাও এরকম ধরনের এনভায়রনমেন্ট দেখিনি যেখানে সরি বলতে হবে নালে কাজ করবো না…কোন কোন ডিগ্রিতে সরি বলতে হবে কি কিভাবে সব আমাদের কাছে রেকর্ডে রয়েছে কল রেকর্ডেও রয়েছে।” সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণত টাকা না দিলে বা ডিফল্ট করলে শুটিং বন্ধ হওয়ার কথা, কিন্তু অর্কর দাবি অগ্রিম টাকা দেওয়ার অপরাধেও তাদের কাজ আটকে দেওয়া হয়েছিল! ক্ষুব্ধ প্রযোজকের কথায়, “লটওয়াইজ পেমেন্ট করা হয়নি, এডভান্সে তুমি টাকা দিয়েছো তার জন্য কাজ বন্ধ হয়েছে।” কোন স্তরে ‘সরি’ বললে কাজ চালু করা হবে সেই দরকষাকষির সমস্ত প্রমাণ ও কল রেকর্ড তাদের কাছে রয়েছে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
এই বিতর্কের মাঝে ‘কোনে দেখা আলো’ সিরিয়ালের শুটিং সেটে অভিনেতাদের জোর করে আটকে রাখা এবং হুমকির প্রসঙ্গটিও সামনে এনেছেন অর্ক। তিনি অভিযোগ করেন যে, আর্টিস্ট ফোরামের নিদান থাকা সত্ত্বেও তাদের ধারাবাহিকের প্রায় ৩৮ জন অভিনেতা-অভিনেত্রী লিখিতভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তাঁদের ওপর মারাত্মক মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। সেট বাউণ্ডারির বাইরে থেকে ফোনে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি ফাঁস করে অর্ক বলেন, “তাদেরকে ফোন করে বলা হয়েছে তুমি কেন এসছো…তাদেরকে ক্রিমিনালি ইন্টিমিডিয়েট করার একটা এঙ্গেল এসছে।” আইনি পরিণতির ভয়ে পরবর্তীতে এক কর্মকর্তা ফোরাম থেকে পদত্যাগ করে ওপরতলার নির্দেশের কথা স্বীকার করেছেন বলেও অর্ক দাবি করেন। এছাড়া অভিনেতা রাহুলের মৃত্যুর ড্রোন ফুটেজ নিয়ে চলা বিতর্কে তিনি সাফ জানান, তদন্ত চলাকালীন আইনি বাধ্যবাধকতা এবং মানবিকতার খাতিরেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ভিডিও পাবলিক করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: বিচ্ছেদের মুহূর্তে চরম মোড়! পারুল রায়ানের আসন্ন সন্তানকে নিয়ে বিরাট সিদ্ধান্ত দাদুর! দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
টলিউডের এই নোংরা ক্ষমতার লড়াইয়ের জেরে গত এক বছরে প্রায় ২০-২৫ দিন শুটিং বন্ধ রাখতে হয়েছে অর্গ্যানিক স্টুডিওজ-কে। এর ফলে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চ্যানেলগুলোর কাছে প্রযোজকদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ টেকনিশিয়ানদের রুটিরুজিতে। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে এবং ইন্ডাস্ট্রিতে একটি সুস্থ কালচার ফিরিয়ে আনতে এবার আর কোনো আপস নয়, বরং আর্টিস্ট ফোরাম ও ফেডারেশনের এই ‘মাসেল ফ্লেক্সিং’-এর বিরুদ্ধে সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন অর্ক গাঙ্গুলী। আইনি পথেই এই সিন্ডিকেট রাজের অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন তিনি। এখন দেখার, অর্কর এই আইনি লড়াই এবং বিস্ফোরক মন্তব্যের জবাবে আর্টিস্ট ফোরাম ও টলিউডের অন্যান্য প্রভাবশালী মহল কী পদক্ষেপ নেয়।

