সত্যজিতের হাত ধরে শুরু জীবন সংগ্রাম! সেখান থেকে জাতীয় পুরস্কার লাভ! অভিনয় ও পরিচালনার ছয় দশক কাটিয়ে ফেললেন অপর্ণা সেন!

বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত যে কজন শিল্পী নিজেদের মেধা ও মনন দিয়ে ভারতীয় সিনেমাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন, অপর্ণা সেন (Aparna Sen) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৪৫ সালের ২৫শে অক্টোবর কলকাতায় এক অত্যন্ত সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক ও নির্মাতা চিদানন্দ দাসগুপ্ত এবং মাতা কস্টিউম ডিজাইনার সুপ্রিয়া দাসগুপ্ত। পারিবারিক সূত্রেই শিল্পের আবহে বড় হওয়া অপর্ণার আত্মীয়তার বন্ধন ছিল কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গেও। শৈশব থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর টান ছিল প্রবল, যা পরবর্তীকালে তাঁকে বাংলা সিনেমার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত করে।

অপর্ণা সেনের চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয় বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তিন কন্যা’ চলচ্চিত্রের ‘সমাপ্তি’ অংশে চঞ্চল কিশোরী মৃণ্ময়ীর চরিত্রে অভিনয় করে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন। এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দীর্ঘ ছয় দশকের ক্যারিয়ারে তিনি ‘আকাশ কুসুম’, ‘মেম সাহেব’, ‘বসন্ত বিলাপ’ এবং ‘জীবন সৈকতে’-র মতো অসংখ্য জনপ্রিয় ও শৈল্পিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। কেবল বাংলা নয়, হিন্দি সিনেমাতেও তিনি নিজের অভিনয়শৈলীর ছাপ রেখেছেন এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘জন অরণ্য’ ও ‘পিকু’-র মতো চলচ্চিত্রে কাজ করে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন।

ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করার পাশাপাশি অপর্ণা সেন নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন অত্যন্ত সফল এবং সংবেদনশীল পরিচালক হিসেবে। ১৯৮১ সালে তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’ মুক্তি পায়, যা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘গোল্ডেন ইগল’ পুরস্কার জয় করেন। এরপর তিনি ‘পরমা’, ‘সতী’, ‘পারমিতার একদিন’, ‘মিস্টার এন্ড মিসেস আইয়ার’ এবং ‘গয়নার বাক্স’-র মতো অসাধারণ সব ছবি উপহার দিয়েছেন। নারী মনের গহীন কোণ এবং সমাজের সূক্ষ্ম জটিলতাগুলোকে পর্দার ফ্রেমে বন্দি করার অসামান্য ক্ষমতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

পেশাদার জীবনের আকাশচুম্বী সাফল্যের পাশাপাশি অপর্ণা সেনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল বেশ বৈচিত্র্যময় ও ঘটনাবহুল। তিনি তিনবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন বিজ্ঞাপন নির্মাতা সঞ্জয় সেন, যাঁর সাথে তাঁর বড় মেয়ে কমলিনীর জন্ম হয়। পরবর্তীতে তিনি প্রখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক মুকুল শর্মাকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের সুযোগ্য কন্যা কঙ্কনা সেন শর্মা বর্তমানে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের এক শক্তিশালী অভিনেত্রী। মুকুল শর্মার সাথে বিচ্ছেদের পর তিনি অধ্যাপক ও লেখক কল্যাণ রায়কে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়েও তিনি সবসময় নিজের কাজকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং দৃঢ়তার সাথে পথ চলেছেন।

আরও পড়ুনঃ দিতিকে নিজের করে পেতে পুলস্ত্যের নতুন চাল! পরপুরুষের হাতে সিঁদুর পরার আগেই নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে দিল দিতি! গোরা কি পারবে তাকে বাঁচাতে? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

বর্তমানে ৮০ বছর বয়সে পদার্পণ করেও অপর্ণা সেন সমানভাবে সক্রিয় এবং সৃষ্টিশীল। ভারত সরকারের ‘পদ্মশ্রী’ সম্মাননাসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত এই শিল্পী আজও অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্য লেখা ও পরিচালনার কাজে নিজেকে মগ্ন রেখেছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের আভিজাত্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন তাঁর মাধ্যমেই সজীব হয়ে আছে। কেবল একজন অভিনয়শিল্পী বা পরিচালক হিসেবেই নয়, একজন বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবেও তিনি বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

Back to top button