‘রিলস দেখে গান শেখা যায় না, ওসব শুধু…’ রিলসের চক্করে কি হারিয়ে যাচ্ছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত! সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে কড়া বার্তা গায়িকা কৌশিকী চক্রবর্তীর!

কৌশিকী চক্রবর্তী (Kaushiki Chakraborty) ভারতের বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী। ১৯৮০ সালে কলকাতায় এক প্রথিতযশা সঙ্গীত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী এবং মা চন্দনা চক্রবর্তী উভয়েই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিকপাল। ছোটবেলা থেকেই গানের আবহে বড় হওয়া কৌশিকী মাত্র দু’বছর বয়স থেকেই সুরের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তিনি পাতিয়ালা ঘরানার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর গায়কিতে যেমন রয়েছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীরতা, তেমনই রয়েছে আধুনিক মননশীলতা, যা তাঁকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।
তাঁর কর্মজীবন বা ক্যারিয়ার অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ অ্যাকাডেমিতে প্রথাগত তালিম নেওয়ার পর তিনি খুব অল্প বয়সেই পেশাদার মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করেন। ভারতের প্রায় সমস্ত বড় সঙ্গীত সম্মেলন ছাড়াও তিনি লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হল থেকে শুরু করে আমেরিকার কার্নেগি হল পর্যন্ত বহু আন্তর্জাতিক মঞ্চ জয় করেছেন। ধ্রুপদী খেয়াল ও ঠুমরির পাশাপাশি তিনি ভজন এবং কিছু বিশেষ চলচ্চিত্রের গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত কৌশিকী বর্তমান প্রজন্মের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক প্রধান অনুপ্রেরণা।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনা অত্যন্ত গভীর। তিনি মনে করেন, আজকের ১৫-৩০ সেকেন্ডের রিলস বা শর্ট ভিডিও মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্য নিয়ে শোনার বিষয়, সেখানে এই অতি-সংক্ষিপ্ত ভিডিওর সংস্কৃতি এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। তবে তিনি একে সরাসরি নেতিবাচক না দেখে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষপাতি, যাতে করে ধ্রুপদী শিল্পকেও প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নেওয়া যায়।
সোশ্যাল মিডিয়াকে তিনি মূলত প্রচারের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন, শিক্ষার বিকল্প হিসেবে নয়। তাঁর মতে, একটি ছোট ভিডিও ক্লিপ দেখে হয়তো একজন নতুন শ্রোতা কোনো রাগ বা শিল্পী সম্পর্কে জানতে পারেন, যা তাঁর মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সামান্য অংশ শুনে পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রস আস্বাদন করা অসম্ভব। একজন প্রকৃত রসিকের জন্য লাইভ কনসার্ট বা পূর্ণদৈর্ঘ্যর রেকর্ড শোনার কোনো বিকল্প নেই বলেই তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
আরও পড়ুনঃ ‘ইন্দ্রানী হালদার এখনও ফুরিয়ে যায়নি…’ দীর্ঘ ৩ বছরের বিরতির পর মুখ খুললেন ইন্দ্রাণী হলদার! অসুস্থতা থেকে ফেরা আর নতুন শুরু নিয়ে অকপট ‘মামণি’!
কৌশিকী চক্রবর্তী নতুন প্রজন্মের মেধার ওপর অগাধ আস্থা রাখেন। তিনি মনে করেন, জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য সঙ্গীতের বিশুদ্ধতা বিসর্জন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি সঠিক মাধুর্য ও আন্তরিকতা দিয়ে গান পরিবেশন করা যায়, তবে আধুনিক প্রজন্মও সমানভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হবে। শিল্পের মান এবং দীর্ঘ সাধনা বা রিয়াজের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বার্তা দিয়েছেন যে, প্রযুক্তির বদল ঘটলেও ধ্রুপদী সুরের আবেদন চিরকাল অমলিন থাকবে।

