‘অসম্মান সয়েও কি টিকে থাকতে হয় গ্ল্যামার দুনিয়ায়?’ নুন আনতে পান্তা ফুরায় সংসারে, বিয়ের পর চরম অভাব, স্ত্রী নিবেদিতাকে সঙ্গী করেই আজ সাফল্যের শিখরে সুজন নীল মুখোপাধ্যায়!

বাংলা বিনোদন জগতের অন্যতম দক্ষ অভিনেতা সুজন নীল মুখোপাধ্যায় ( Sujon Neel Mukherjee)। দীর্ঘ কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে তিনি নিজেকে থিয়েটার, সিনেমা এবং টেলিভিশনের এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গ্রুপ থিয়েটারের মঞ্চ থেকে তার অভিনয়ের হাতেখড়ি। বর্তমানে তিনি জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল থেকে শুরু করে বড় পর্দার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নিয়মিত অভিনয় করছেন। তবে আজকের এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ এবং কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস, যা তিনি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

সুজনের ব্যক্তিগত জীবনের লড়াইয়ের শুরুটা ছিল অনেকটা সিনেমার গল্পের মতোই রোমাঞ্চকর এবং চ্যালেঞ্জিং। অভিনেতা জানান, কেরিয়ারের শুরুর দিকে নিবেদিতাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত যখন নেন, তখন তাদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। অত্যন্ত সাধারণ একটি ভাড়া বাড়িতে তাদের দিন কাটত, যেখানে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রও ছিল না। এমনকি তীব্র গরমেও বাড়িতে কোনো ফ্রিজ বা ঠান্ডা জলের ব্যবস্থা ছিল না। বিলাসিতা তো দূরের কথা, জীবনের নূন্যতম চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য তাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে। এই কঠিন দিনগুলোতে একে অপরের পাশে থাকাই ছিল তাদের টিকে থাকার একমাত্র সম্বল।

ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা করে নেওয়ার লড়াই নিয়ে অভিনেতা জানান, একজন শিল্পীর পথ চলায় অনিশ্চয়তা সবসময় সঙ্গী থাকে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, অনেক সময় প্রতিভাকে গুরুত্ব না দিয়ে নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে শিল্পীদের আটকে রাখা হয়। পেশাদার জীবনে প্রতিকূল পরিবেশ বা অসম্মানজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে তিনি সবসময় নিজের আদর্শে অটল থেকেছেন। সুজন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সম্মানহীন কোনো পরিবেশে কাজ করার চেয়ে তিনি কাজ ছেড়ে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করেন। কাজের অভাব বা আর্থিক অনিশ্চয়তার চেয়েও নিজের শিল্পীসত্তা ও আত্মসম্মান বজায় রাখা তার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

আরও পড়ুন: নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে কেবল মিঠির জন্যই বেঁচে থাকার অঙ্গীকার পল্লবীর, সাগরের চলে যাওয়ার রহস্য উন্মোচনের প্রতিজ্ঞা নিল পল্লবী!

ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের টানাপোড়েনের এক চরম মুহূর্তের কথা স্মরণ করে সুজন জানান তার মায়ের প্রয়াণের দিনের কথা। একজন অভিনেতাকে যে কতটা আবেগহীন হতে হয়, তার প্রমাণ মেলে সেই ঘটনায়। দাহকার্য শেষ করে ভোররাতে বাড়ি ফিরে সকাল ৮টার মধ্যেই তাকে নাটকের রিহার্সালে পৌঁছাতে হয়েছিল। মনের ভেতরে পাহাড়প্রমাণ শোক আর চোখে জল নিয়ে তাকে অভিনয়ের মহড়া দিতে হয়েছে। শিল্পের প্রতি এই যে চরম দায়বদ্ধতা, তা প্রমাণ করে যে একজন অভিনেতার স্ট্রাগল কেবল পর্দার সামনে নয়, বরং তার অন্তরের গহীনেও প্রতিনিয়ত চলতে থাকে।

পরিশেষে, সুজন নীল মুখোপাধ্যায়ের এই দীর্ঘ সফর বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তিনি মনে করেন, কেবল আর্থিক সংকটই স্ট্রাগল নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের কাজের মান ধরে রাখা এবং নীতি বিসর্জন না দেওয়াই আসল লড়াই। তার মতে, ইন্ডাস্ট্রি তাকে অনেক চড়াই-উতরাই দেখিয়েছে, কিন্তু অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা আর জীবনযুদ্ধের সেই কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোই তাকে আজকের পরিণত মানুষ ও শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছে। পরিশ্রম ও ধৈর্যই যে সাফল্যের একমাত্র পথ, সুজনের জীবনকাহিনী তারই প্রতিফলন।

Back to top button