পকেটে টাকা ছিল না, ছিল কেবল অভিনয়ের জেদ! শূন্য হাতে লড়াই শুরু করে আজ টলিউডের উজ্জ্বল নক্ষত্র, সুজন নীলের ২৭ বছরের রক্ত-জল করা সংগ্রামের গল্প!

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে টলিউড এবং থিয়েটার জগতে নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শক মনে জায়গা করে নিয়েছেন সুজন নীল মুখোপাধ্যায় (Sujan Neel Mukherjee)। অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই থিয়েটারের আঙিনা থেকে তাঁর পথচলা শুরু। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া এই শিল্পী ছোট থেকেই দেখেছিলেন জীবনের কঠিন বাস্তব। তাঁর সাবলীল অভিনয় এবং স্পষ্টবক্তা হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর একটি আলাদা পরিচিতি রয়েছে। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের জীবনের সেই চড়াই-উতরাই এবং পর্দার পেছনের সংগ্রামের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন, যা অনেক তরুণ অভিনেতার কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
সুজনের কর্মজীবন মূলত শুরু হয় থিয়েটারের হাত ধরে। প্রায় দীর্ঘ সাতাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি অভিনয়ের সাথে যুক্ত। তিনি কেবল একজন দক্ষ অভিনেতাই নন, বরং নাট্য নির্দেশক হিসেবেও অত্যন্ত সফল। ‘চেতনা’ নাট্যগোষ্ঠীর মাধ্যমে তিনি মঞ্চে একের পর এক কালজয়ী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর যাত্রা বহু বছরের। বিভিন্ন জনপ্রিয় মেগা সিরিয়ালে তাঁকে কখনও ইতিবাচক, কখনও বা জটিল ধূসর চরিত্রে দেখা গেছে। অভিনয়ের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত সমাজ এবং সাধারণ মানুষের আবেগ ফুটিয়ে তোলাতেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করেন। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন ইন্ডাস্ট্রির কাজের ধরন কীভাবে বছরের পর বছর বদলেছে।
ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার লড়াইটা সুজনের জন্য সহজ ছিল না। তিনি জানিয়েছেন, কেরিয়ারের শুরুর দিকে নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিবাহিত জীবন ছিল প্রচণ্ড অর্থকষ্টের। সেই সময় এক চিলতে ঘরে কোনো বিলাসিতা ছিল না; এমনকি একটা ফ্রিজ বা এসি কেনার সামর্থ্যও ছিল না তাঁদের। বাড়ি ভাড়া পাওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে তাঁদের লড়াই করতে হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি এবং ব্র্যাকেটে বন্দি করে রাখার মানসিকতা নিয়েও তিনি সরব হয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক কাজ করার সুযোগ পাওয়া এবং নিজের সত্তা বজায় রাখাটাই একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।
আরও পড়ুন: ‘অসম্মান সয়েও কি টিকে থাকতে হয় গ্ল্যামার দুনিয়ায়?’ নুন আনতে পান্তা ফুরায় সংসারে, বিয়ের পর চরম অভাব, স্ত্রী নিবেদিতাকে সঙ্গী করেই আজ সাফল্যের শিখরে সুজন নীল মুখোপাধ্যায়!
বর্তমানে সুজন নীল মুখোপাধ্যায় একইসাথে টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দাপিয়ে কাজ করছেন। তাঁর কাজের তালিকায় রয়েছে অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজ। বিশেষ করে ওটিটি-তে ‘একেন বাবু’ থেকে শুরু করে একাধিক রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। কাজের চাপে ক্লান্ত না হয়ে তিনি আজও নিজেকে নতুন নতুন চরিত্রে ভেঙে চলেছেন। ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁকে অনেকে ‘মুখচোরা’ ভাবলেও, তিনি আদতে নিজের কাজের জগতেই মগ্ন থাকতে ভালোবাসেন। শুটিংয়ের ফাঁকে দাবার বোর্ড বা কোনো ভালো বই তাঁর নিত্যসঙ্গী।
এই প্রতিবেদনের শেষ অংশে অভিনেতা এক বিশেষ আবেগঘন স্মৃতির কথা শুনিয়েছেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর মা। ২০২২ সালে মায়ের প্রয়াণের সময়ও তিনি কাজ থেকে বিরতি নেননি। দাহকার্য শেষ করে ভোররাতে বাড়ি ফিরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনি যোগ দিয়েছিলেন নাটকের রিহার্সালে। মঞ্চে যখন তাঁর কান্নার দৃশ্য ছিল, তখন পর্দার অভিনয়ের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল ব্যক্তিগত শোক। এই পেশাদারিত্ব এবং কাজের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সুজন নীল মুখোপাধ্যায়কে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এভাবেই অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের সমৃদ্ধ করতে চান।

