‘ক্ষমা চেয়ে কাজ করার ইচ্ছে আর নেই…’ ‘মুচলেকা দিয়ে টলিউডে কাজ করব না!’ ফেডারেশন বিতর্কে সাফ জবাব সুদেষ্ণা রায়ের!

বাঙালি দর্শকদের কাছে সুদেষ্ণা রায় (Sudeshna Roy) এক অত্যন্ত পরিচিত এবং শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেত্রী এবং নামী সাংবাদিক। সত্তর বা আশির দশকে থিয়েটারের মঞ্চ থেকে অভিনয় জীবন শুরু করে পরবর্তীতে তিনি ‘আজকাল’, ‘টেলিগ্রাফ’ ও ‘সানন্দা’র মতো প্রথম সারির পত্রিকায় দাপটের সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন। ১৯৯৪ সালে পরিচালক অভিজিৎ গুহর সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি ছোটপর্দায় ‘আমি নারী’ বা ‘পরমা’র মতো কালজয়ী অনুষ্ঠান উপহার দেন। এরপর বড়পর্দায় ‘শুধু তুমি’, ‘তিন ইয়ারি কথা’, ‘ক্রস কানেকশন’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের ‘আপিশ’-এর মতো প্রায় ৩৫টিরও বেশি চলচ্চিত্র পরিচালনা করে টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেদের এক আলাদা ও স্থায়ী জায়গা তৈরি করেছেন এই গুণী মানুষটি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ফেডারেশনের নানান নিয়মকানুন নিয়ে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সুদেষ্ণা রায়। আলোচনার সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টি ছিল বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন ‘স্ক্রিনিং কমিটি’ এবং ছবি মুক্তির ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ। পরিচালক স্পষ্ট ভাষায় জানান, পুজো বা অন্য কোনো উৎসবের মরসুমে কোন ছবি প্রেক্ষাগৃহে রিলিজ হবে, কারা কটা থিয়েটার পাবে বা প্রাইম টাইম দেওয়া হবে সেটা কোনো কমিটি ঠিক করে দিতে পারে না। তাঁর মতে, সিনেমা কোনো কর্পোরেট অফিস নয় যে আগে থেকে কথা দিয়ে বা নিয়ম মেনে সবটা চলবে। ছবি তৈরিতে অনেক অনিশ্চয়তা থাকে, তাই জোর করে ডেট চাপিয়ে দিলে বা ফেয়ার কমপিটিশন না থাকলে বাংলা চলচ্চিত্রের কোনো উপকার হবে না।
ইন্ডাস্ট্রির আরও একটি বড় বিতর্ক অর্থাৎ টেকনিশিয়ানদের ফেডারেশনের সঙ্গে পরিচালকদের আইনি লড়াই নিয়ে মুখ খুলেছেন সুদেষ্ণা রায়। তিনি জানান, ফেডারেশনের কিছু কিছু একতরফা নিয়মাবলীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা কয়েকজন মিলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। যদিও কয়েকবার শুনানির পর আদালত সেই মামলা খারিজ করে দেয়। পরিচালক স্পষ্ট করে দেন যে, তাঁরা কখনই কোনো টেকনিশিয়ানের কাজ কেড়ে নিতে চাননি, কারণ এই কলাকুশলীরাই তাঁদের পরিবার। তবে মামলা খারিজ হওয়ার পর অনেকেই আশা করেছিলেন পরিচালকেরা হয়তো ক্ষমা চাইবেন। কিন্তু সুদেষ্ণা রায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “এত বছর ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার পর এখন আর অন্যায়ভাবে মুচলেকা দিয়ে বা ক্ষমা চেয়ে কাজ করার ইচ্ছে আমার নেই, কারণ আমরা কোনো ভুল করিনি।”
টলিউডের কাজের পরিবেশ এবং শুটিংয়ের আগের কড়াকড়ি নিয়েও নিজের আপত্তির কথা জানিয়েছেন পরিচালক। সম্প্রতি অভিনেতা দেবের একটি বক্তব্যকে সমর্থন করে সুদেষ্ণা রায় বলেন, শুটিংয়ের আগে চরিত্রের ‘লুক সেট’ করা বা লোকেশন দেখতে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় আগে ফেডারেশনকে অফিশিয়ালি জানাতে হবে এবং পারমিশন নিতে হবে এই নিয়মটা কাজের স্বাধীনতায় বাধা দেয়। তিনি বলেন, অনেক সময় হুট করে রাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরের দিন সকালে লুক সেট করতে হয়, কারণ অভিনেতাদের অন্য কাজের ব্যস্ততা থাকে। এই ধরনের নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে আদতে টলিউডে কাজের সংখ্যা কমে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। তাঁর মতে, নিয়মের কড়াকড়ি শান্তি আনতে পারে, কিন্তু তা যেন সৃজনশীলতার পথে অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুনঃ সোনালি শাড়ি, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর! পাশে মনের মানুষ! তবে কি গোপনে বিয়ে সারলেন ডায়মন্ড দিদি? নাকি আসছে নতুন মেগা?
সুদেষ্ণা রায় মনে করেন, সিনেমা কোনো নিয়মের খাঁচায় বন্দি পাখি নয়, এটি একটি স্বাধীন শিল্পমাধ্যম। কোনো কমিটি যেমন ছবি আঁকিয়েকে বলে দিতে পারে না কী আঁকতে হবে, ঠিক তেমনি সিনেমাও কোনো কমিটির কথায় চলতে পারে না। তবে প্রযুক্তি বদলেছে এবং এখন সাধারণ মোবাইল হাতে নিয়েও অনেকে চমৎকার শর্ট ফিল্ম বা রিলস বানাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মকে স্বাগত জানিয়ে তিনি দর্শকদের অনুরোধ করেন, তাঁরা যেন ওটিটি বা প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সব ধরনের ছবি দেখেন এবং তারপর ভালো-মন্দ বিচার করেন। কোনো অর্গানাইজড কমিটির নিয়মে নয়, বরং দর্শকের ভালোবাসাতেই বাংলা সিনেমা আগামী দিনে বেঁচে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই বর্ষীয়ান পরিচালক।

