‘আমরা সাধারণ মানুষ, তাই বারবার হেরে যাই…’ বাবার মৃ’ত্যুশয্যায় ডিভোর্সের কঠিন সিদ্ধান্ত! বুকে চেপে রাখা কষ্টগুলো ভাগ করে নিলেন অভিনেত্রী খেয়ালী দস্তিদার!

বাঙালি দর্শকদের কাছে খেয়ালী দস্তিদার (Kheyali Dastidar) একটি অত্যন্ত পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম। বাংলা ছোটপর্দায় নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে নানান ধরণের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বাঙালি ড্রয়িংরুমে তুমুল জনপ্রিয়তা পান এবং তাঁকে বাংলা টেলিভিশনের প্রথম সারির তারকাদের একজন ধরা হয়। কিংবদন্তি থিয়েটার ব্যক্তিত্ব জোছন দস্তিদার এবং চন্দ্রা দস্তিদারের সুযোগ্য কন্যা খেয়ালীদেবী শুধু অভিনয়েই নন, নাট্যদল ‘চার্বাক’-এর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে এবং একজন প্রতিভাবান চিত্রনাট্যকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবেও সংস্কৃতি মহলে সমান সমাদৃত। সম্প্রতি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের ফেলে আসা কঠিন দিন, বর্তমান দাম্পত্য এবং সমাজ নিয়ে অত্যন্ত মনোগ্রাহী কিছু কথা শেয়ার করেছেন এই গুণী শিল্পী।

প্রথম বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েন এবং ডিভোর্সের সেই যন্ত্রণাদায়ক সিদ্ধান্তের কথা মনে করে অভিনেত্রী জানান, তাঁর প্রথম স্বামী দেবাংশুকে তাঁর বাবা-মা ভীষণ ভালোবাসতেন। তাই এই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত তাঁদের জন্য ছিল একটি বিশাল মানসিক আঘাত। পরিস্থিতি আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছিল কারণ সেই সময় অভিনেত্রীর বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। চারপাশের মানুষের নানা কটু কথা ও সামাজিক চাপ সত্ত্বেও নিজের আত্মসম্মান ও মুক্তির স্বার্থে অভিনেত্রীকে সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, যা প্রমাণ করে সমাজ ও পরিবারের প্রত্যাশা সামলে একজন নারীর জন্য নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা লড়াইয়ের।

জীবনের সেই ঝোড়ো অধ্যায় পার করে খেয়ালীদেবী নতুন করে সংসার পাতেন বিশিষ্ট অভিনেতা ও পরিচালক অরিন্দম গাঙ্গুলী এর সাথে, এবং দেখতে দেখতে তাঁরা দাম্পত্যের ২৫ বছর পার করে ফেলেছেন। অরিন্দমবাবুর সাথে তাঁর এই দীর্ঘ সম্পর্কের মূল রসায়ন যে গভীর পারস্পরিক বোঝাপড়া ও স্বস্তিদায়ক নীরবতা, তা তিনি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অভিনেত্রী জানান, সাধারণ দম্পতিদের মতো তাঁদের সারাদিন অবান্তর কথা বলতে হয় না প্রায় ৪৫ মিনিটের একান্তে বসার সময়ে হয়তো ৪৩ মিনিটই তাঁরা দুজনে সম্পূর্ণ চুপ করে থাকেন। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁদের জীবন থেকে পরনিন্দা-পরচর্চা সম্পূর্ণ উধাও, যা বর্তমান যুগের জটিল সম্পর্কের ভিড়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে একজন সচেতন সমাজমনস্ক শিল্পী হিসেবে চারপাশের উত্তাল সামাজিক পরিস্থিতি এবং ‘সিস্টেম’-এর ভূমিকা নিয়েও নিজের স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেছেন অভিনেত্রী। তিনি অতীতেও তাঁর লেখা ‘শিরোনাম’ নাটকে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার মতো তীব্র সামাজিক ব্যাধি নিয়ে সরব হয়েছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর কণ্ঠে একধরনের বাস্তবসম্মত হতাশার সুরও শোনা গেছে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা এই বিশাল সিস্টেমের সামনে মাঝেমধ্যে সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েও যখন কোনো পরিবর্তন দেখতে পায় না, তখন তারা একসময় হেরে গিয়ে চুপচাপ দর্শকের আসনে বসে পড়তে বাধ্য হয়।

আরও পড়ুনঃ ‘গঙ্গা থেকে যখন কাজ করে উঠছি, শ্বশুরবাড়ির একটা লোকও ছিল না,’ ‘সহায় সম্বলহীন নিঃসঙ্গ হয়ে আমি আর আমার মেয়ে দাঁড়িয়ে!’ অতীতের চরম তিক্ততা ভুলে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন নবনীতা?

সাক্ষাৎকারের শেষভাগে খেয়ালীদেবী তাঁদের সন্তানকে নিয়ে অত্যন্ত গর্ব ও কিছুটা আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। বাবা-মায়ের মতোই তাঁদের ছেলেও অত্যন্ত সৎ ও পরিচ্ছন্ন মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে এবং কোনো রকম গসিপ পছন্দ করে না। অভিনেত্রী মৃদু হেসে বলেন, বর্তমান যুগের চতুর দুনিয়ার নিরিখে হয়তো তাঁর ছেলেকে কিছুটা ‘বোকা’ মনে হতে পারে, কিন্তু একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে তাকে গড়ে তুলতে পেরে তাঁরা ভীষণ তৃপ্ত। পরিশেষে তিনি জানান, জীবন হলো এমন এক অভিজ্ঞতা যা মানুষকে একাধারে হাসায়, কাঁদায় এবং গভীরভাবে ভাবায় আর এই ইতিবাচক জীবনদর্শনই খেয়ালী দস্তিদারকে দর্শকদের কাছে আজীবন অনন্য করে রাখবে।

Back to top button