‘শিখে আসতে হয়, না শিখলে টিকে থাকা যায় না, যেমন আমি…’ নতুন বেড়ে ওঠা শিল্পীদের উদ্দেশ্যে অকপটে ডাঃ বাসুদেব মুখার্জি! কেন অভিনয় জগট থেকে সরে গেলে তিনি?

বাংলা টেলিভিশনের পর্দায় (Bengali Television) এমন অনেক মুখ আছে যারা আমাদের পরিবারের অংশ হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ডাঃ বাসুদেব মুখার্জি (Basudeb Mukherji)। পর্দার ‘আদর্শ বাবা’ বা ‘গম্ভীর অথচ স্নেহশীল শ্বশুর’ হিসেবে তিনি কয়েক দশক ধরে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, তিনি কলকাতার অন্যতম প্রথিতযশা স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিল অস্ত্রোপচার আর লাইট-সাউন্ড-ক্যামেরার গ্ল্যামার এই দুই বিপরীত মেরুকে তিনি সমান্তরালে বয়ে নিয়ে চলেছেন সাফল্যের সাথে।
শৈশব থেকেই অভিনয়ের প্রতি এক অমোঘ টান ছিল তার। ছাত্রজীবনে কৃতি ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও থিয়েটার এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেননি। বাংলা সিরিয়ালের স্বর্ণযুগে ‘একা আকাশের নিচে’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে তিনি প্রভূত জনপ্রিয়তা পান। পরবর্তীতে ‘ইচ্ছে নদী’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘কুসুম দোলা’-র মতো একাধিক মেগা ধারাবাহিকে তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেবল ছোট পর্দায় নয়, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা সিরিজের সিনেমা ‘রয়্যাল বেঙ্গল রহস্য’-তে মহিতোষ সিংহ রায়ের চরিত্রে তার অভিনয় আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।
বর্তমানে অভিনয়ে তাকে একটু কম দেখা গেলেও, চিকিৎসা পরিষেবায় তিনি এখনও সমানভাবে সক্রিয়। অনেকেই প্রশ্ন করতেন একজন ব্যস্ত চিকিৎসক হয়ে কীভাবে তিনি শ্যুটিংয়ের সময় বের করেন? ডাঃ মুখার্জি সবসময়ই বিশ্বাস করেন, ইচ্ছা থাকলে সময়ের অভাব হয় না। সকালে হাসপাতালের রাউন্ড এবং ওটি সেরে বাকি সময়টা তিনি উৎসর্গ করেন অভিনয়ের জন্য। তার সহকর্মীরাও প্রায়ই অবাক হন তার এই কর্মক্ষমতা দেখে।
সম্প্রতি সৌরভের সঞ্চালনায় জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘টাইম অ্যান্ড টাইট’-এ এসে তিনি মেলে ধরলেন তার বর্ণময় জীবনের নানা অজানা অধ্যায়। আগে মঞ্চে তার অভিনীত ‘কাবুলিওয়ালা’ নাটকটি ছিল দর্শকদের কাছে এক বিশেষ পাওনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কালজয়ী চরিত্রের মানবিকতা তিনি নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতেন, যা আজও অনেক নাট্যপ্রেমীর স্মৃতিতে টাটকা। তার বর্তমান থিয়েটার প্রজেক্ট হলো সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সিনেমা এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘জলসাঘর’। সেখানে প্রধান চরিত্র বিশ্বম্ভর রায় হিসেবে এখন মঞ্চে অবতীর্ণ হচ্ছেন তিনি।
দীর্ঘদিন টেলিভিশনের পর্দায় দাপিয়ে অভিনয় করলেও, বাসুদেব মুখার্জি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে মেগা সিরিয়ালের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর শিডিউলে তিনি আর ফিরতে আগ্রহী নন। তবে অভিনয়ের প্রতি তার ক্ষুধা এখনও মেটেনি। তার এখনকার লক্ষ্য হলো চলচ্চিত্র বা সিনেমা।
তিনি বলেন, “সিনেমা করার ইচ্ছে অবশ্যই আছে, কিন্তু সেখানে তো অনেক নিয়ম-নীতি রয়েছে। চাইলেই যে সেখানে সুযোগ মিলবে বা আমি কাজ করতে পারব, তা নিশ্চিত নয়।” তবে ভালো প্রস্তাব এবং সুযোগ আসলে তিনি যে আবারও বড় পর্দায় ম্যাজিক দেখাতে প্রস্তুত, তা জানাতে ভোলেননি।
আরও পড়ুনঃ ‘এটা আমার রোগ, আমি চেষ্টা করেছি ঠিক করার…যদি পারতাম তাহলে আমার এই অবস্থা হতো না’ গোপন রোগ নিয়ে অকপটে তথাগত মুখার্জি!
আজকাল অনেক তরুণ-তরুণী ভাবেন যে লুক ভালো হলে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা থাকলে অভিনয় শেখার প্রয়োজন নেই। এই ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেছেন ডাঃ মুখার্জি। তিনি নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে জানান যে, তিনি চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও অভিনয়ে আসার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি রীতিমতো অভিনয়ের ব্যাকরণ শিখে এবং দীর্ঘ সাধনার মাধ্যমে এই জায়গায় পৌঁছেছেন। আজ তিনি যে অভিনয়ের দক্ষতায় দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন, তার পুরো কৃতিত্বই তিনি দিয়েছেন তার প্রশিক্ষণ এবং শৃঙ্খলার ওপর।

