‘সবাইকে দেখতাম কত সুন্দর করে সেজে গান গাইছে, আর আমার কাছে এত শাড়িই ছিল না…’ শুরুটা ছিল ভীষন কঠিন! সফলতার ছোঁয়া পেতে করতে হয়েছে লড়াই! কেমন ছিল ঊষা উত্থুপের প্রথম জীবন?

বাংলা থেকে হিন্দি, তামিল থেকে তেলেগু একাধিক ভাষায় গান গাওয়ায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। একবার শুনলেই কানে গেঁথে যায় তাঁর দৃঢ় কণ্ঠস্বর। তিনি হলেন ঊষা উত্থুপ (Usha Uthup)। এখন তাঁকে যেমন ভাবে দর্শকরা দেখেন, শুরুটা কিন্তু মোটেই এতটা মসৃণ ছিল না। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যখন প্রথম গান গাওয়া শুরু করেছিলেন, তখন চারপাশে তাকালেই দেখতেন ছিমছাম সুন্দর মুখ, পরিপাটি ফিগার, দামি শাড়ি পরিহিত মেয়েরা মঞ্চ দখল করে আছে। আর সেই ভিড়ের মাঝখানে তিনি নিজেকে দেখতেন একেবারে আলাদা ভাবে। একটা গোলগাল, সাদামাটা মেয়ে, যেন মঞ্চের পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা, যাকে কেউ খেয়ালই করে না।
তিনি বলেছিলেন, তখন তাঁর কাছে সাজগোজের কোনও বিলাসিতা ছিল না। সুতির শাড়ি পরেই গান গাইতেন, কারণ আলাদা করে শাড়ি কেনার মতো সামর্থ্যই ছিল না। দামি শাড়ি, ঝলমলে পোশাক, এসব তাঁর জীবনের বাস্তবতায় ছিল না। মায়ের শাড়িই ছিল তাঁর ভরসা। কোনও জাঁকজমক নয়, কোনও গ্ল্যামার নয় একদম সাদামাটা সাজেই তিনি উঠে দাঁড়াতেন মাইক্রোফোনের সামনে।
ঊষা উত্থুপ অকপটে স্বীকার করেন, তখন তিনি জানতেন না এই সাদামাটা চেহারা, এই সাধারণ উপস্থিতিই একদিন তাঁর পরিচয় হয়ে উঠবে। সেই সময়টা ছিল লড়াইয়ের, আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার, নিজের জায়গা খুঁজে নেওয়ার। সমাজের চোখে ‘পারফেক্ট’ না হয়েও যে নিজের স্বর, নিজের আত্মাকে বিশ্বাস করা যায় তিনি সেটাই করে গিয়েছেন নিঃশব্দে।
আর সময়ের সঙ্গে বদলেছে জীবন। যখন গানই তাঁর জীবিকা হয়ে উঠল, যখন ইনকাম করতে শুরু করলেন, তখন ধীরে ধীরে নিজের জন্য সুন্দর সুন্দর শাড়ি কিনতে পারলেন। কিন্তু সেই শাড়ির সঙ্গে বদলায়নি তাঁর মন, বদলায়নি তাঁর শিকড়। সাদামাটা সেই মেয়েটাই রয়ে গেছেন, শুধু কাঁধে যোগ হয়েছে আত্মসম্মানের রং।
আরও পড়ুনঃ ‘আমি ওকে কোনও সুযোগ করে দেব না, আমাকে তো কেউ সুযোগ দেয়নি, আমি কেন…’ সুযোগ পেতে গেলে লড়তে হবে! ১ ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়! কার উদ্দেশ্যে এতটা ক’ঠিন অভিনেতা?
এই গল্পটা শুধু ঊষা উত্থুপের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা নয়, এটা আসলে অসংখ্য মেয়ের জীবনের আয়না। যারা প্রথম দিনেই ঝলমলে আলো পায় না, যারা গ্ল্যামারের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না, অথচ ভেতরে ভেতরে অদম্য জেদ আর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলে। ঊষা উত্থুপ দেখিয়ে দিয়েছেন, সৌন্দর্য কোনও নির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা নয়। আত্মবিশ্বাস, নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস আর কঠোর পরিশ্রমই আসল অলংকার। তিনি প্রমাণ করেছেন, পিছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাও একদিন সামনে এসে ইতিহাস তৈরি করতে পারে। দামি শাড়ি নয়, নামী সাজ নয়, নিজের কণ্ঠ, নিজের সত্তা আর নিজের লড়াই দিয়েই যে একজন আইকন হয়ে ওঠা যায়, ঊষা উত্থুপ তার জীবন্ত উদাহরণ। এই গল্প তাই অনুপ্রেরণা, সাহস আর আত্মসম্মানের এক নীরব অথচ শক্তিশালী পাঠ।

