‘রাজনীতিতে গেলে তোমাকে আর মা বলে ডাকব না!’ মেয়ের একটি কথায় কেঁপে উঠেছিল বুক! বদলে গিয়েছিল সিদ্ধান্ত! রাজনীতিতে না কারণ জানালেন অভিনেত্রী অনামিকা সাহা!

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে টলিউডের (Tollywood) বিনোদন জগৎ এবং রাজনীতির ময়দান যেন একাকার হয়ে গেছে। নির্বাচনের মরশুম এলেই রুপোলী পর্দার তারকাদের রাজনৈতিক মঞ্চে ভিড় জমাতে দেখা যায়। কিন্তু এই চেনা স্রোতের বিপরীতে হেঁটে এক্কেবারে ভিন্ন সুর শোনা গেল বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত বর্ষীয়ান অভিনেত্রী অনামিকা সাহার (Anamika Saha) গলায়। সম্প্রতি এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি, রাজনীতিতে যোগদানের প্রস্তাব এবং অভিনেতা দেবকে নিয়ে একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে বিনোদন দুনিয়ায় রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছেন রুপোলী পর্দার এই চিরপরিচিত ‘শাশুড়ি মা’। তাঁর এই অকপট সাক্ষাৎকারটি বর্তমান টলিউড ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের বহু অজানা বাস্তবকে যেন আরও একবার জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।

রাজনীতিতে তারকাদের যোগদানের হিড়িক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনামিকা সাহা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক বড় সিদ্ধান্তের কথা ফাঁস করেন। তিনি জানান, আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে অর্থাৎ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময়ই তাঁর কাছে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার এবং ভোটে দাঁড়ানোর বড়সড় অফার বা প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু সেই লোভনীয় প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন শুধুমাত্র তাঁর একমাত্র মেয়ের কারণে। অভিনেত্রী জানান, রাজনীতিতে যাওয়ার কথা শুনে তাঁর মেয়ে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল, “তুমি যদি রাজনীতিতে যাও, তবে তোমাকে আর মা বলে ডাকবো না।” একমাত্র সন্তানের এই চরম সিদ্ধান্তের পর অনামিকা দেবী আর রাজনীতির ময়দানে পা রাখার কথা ভাবেননি। তিনি সাফ জানান যে, রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচ এবং কাদা ছোড়াছুড়ি বোঝার মতো মানসিকতা তাঁর নেই। তিনি একজন সরল-সাদা মানুষ এবং আজীবন শুধু অভিনয়ের জগতেই বাঁচতে চান।

সাক্ষাৎকারে টলিউডের বর্তমান ‘লবিবাজি’ এবং গ্রুপ থিয়েটার কালচার নিয়েও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। অনামিকা দেবীর মতে, বর্তমান টলিউড ইন্ডাস্ট্রি নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপ বা দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। এখন আর আগের মতো শিল্পীদের কাজের গুণগত মান দেখে মূল্যায়ন করা হয় না, বরং কে কোন লবির অংশ, সেটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র মোস্ট বা জ্যেষ্ঠ অভিনয়শিল্পীদের পরামর্শ নেওয়ার বা তাঁদের সম্মান দেওয়ার নূন্যতম মানসিকতাও এখনকার প্রজন্মের অনেকের মধ্যে নেই। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “আমাকে আজকালকার ছেলেমেয়েরা পাত্তাই দেয় না, তাহলে আমি কেন ওদের সাজেশন দিতে যাব? যেখানে সম্মান নেই, সেখানে অনামিকা সাহাও নেই।” টলিউডের এই গ্রুপ কালচারের কারণেই তাঁর মতো অনেক গুণী শিল্পী দীর্ঘদিন ভালো কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তিনি মনে করেন।

সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটি ঘটে যখন সাক্ষাৎকারে টলিউডের অন্যতম শীর্ষ তারকা তথা সাংসদ দেবকে নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। দেবের সাথে অতীতে ‘হইচই আনলিমিটেড’ ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেওয়া হলে অনামিকা সাহা বলেন, “সেই দেব আর এখনকার দেবের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত।” তাঁর মতে, রাজনীতিতে যাওয়ার পর এবং একের পর এক ছবি প্রযোজনা করে সফল হওয়ার পর দেবের আচরণে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, “দেব এখন আমাকে চিনতেও পারবে কিনা সন্দেহ আছে। ওর মধ্যে আর আগের সেই ব্যাপারটা নেই।” দেবের একের পর এক ছবি বক্স অফিসে হিট হওয়া প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন যে, দেবের ভাগ্য এখন অত্যন্ত সুপ্রসন্ন এবং ঈশ্বরের কৃপা রয়েছে, তাই ছবি চলছে। তবে দর্শকদের মুখ থেকে দেবের কোনো ছবি দেখে বেরোনোর পর “অসাধারণ ছবি হয়েছে” বা মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো কোনো প্রতিক্রিয়া তিনি শোনেননি।

আরও পড়ুনঃ ‘সব ছেলেমেয়েকে কলকাতায় ফেরাবই!’, ‘গোটা যাদবপুরটাই যেন বৃদ্ধাশ্রম!’ ভিন রাজ্য থেকে তরুণ প্রজন্মকে ফেরানোর হুঙ্কার! দেশে বাবা মাকে ফেলে কাউকে বাইরে কাজ করতে দেবেন না অভিনেত্রী তথা বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের!

অনামিকা সাহা পুরোনো দিনের সিনেমা এবং বর্তমানের সিনেমার মধ্যে মেকিং ও আবেগের ফারাকটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগেকার দিনে ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ বা হিন্দি ছবি ‘কোশিস’-এর মতো সিনেমা হতো, যা দেখার পর রাতে বাড়ি ফিরেও দর্শকেরা সেই চরিত্রগুলো নিয়ে ভাবতেন। কিন্তু বর্তমানের ছবিতে সেই চিরন্তন বাঙালি আনা এবং আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে। বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন আর শাশুড়ির চরিত্র না পেলেও, ভালো গল্প ও চরিত্র পেলে তিনি ঠাকুরমার ভূমিকাতেও অভিনয় করতে প্রস্তুত, তবে সেখানে অভিনয়ের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে। বাণিজ্যিক সাফল্যের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে বাংলা ছবির নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি আনা ধরে রাখার জন্য তিনি বর্তমান প্রজন্মের সমস্ত পরিচালক ও প্রযোজকদের প্রতি আহ্বান জানান।

Back to top button