অভাব ঘোচাতে লোকের বাড়িতে কাজ করেছেন স্ত্রী! বিনা চিকিৎসায় দিয়েছেন প্রাণ! কেমন ছিল পরশ পাথরের সৃষ্টিকর্তা তুলসী চক্রবর্তী জীবন?

১৯৪০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে বাংলার স্বনামধন্য অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন তুলসী চক্রবর্তী (Tulsi Chakraborty)। কমেডি চরিত্রে (Comedy Actor) অভিনেতার অভিনয় সত্যি অতুলনীয় ছিল সেই সময়। সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray), উত্তম কুমারের (Uttom Kumar) মতো পরিচালক অভিনেতারাও তুলসি চক্রবর্তীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। পরশপাথর ছবির হাত ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন তুলসী চক্রবর্তী। তার অভিনীত ছবিগুলি আজও দর্শকমহলে দর্শকদের মাঝে জনপ্রিয়।
উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত সাড়ে চুয়াত্তর চলচ্চিত্রে তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় প্রত্যেকের মনে চাপ ফেলে দিয়েছিল। ছবিতে উত্তম সুচিত্রার জুটির চেয়েও বেশি তুলসী চক্রবর্তী অভিনয় দর্শকের মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। শুধুমাত্র সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত পরশপাথর ছবিতেই তাকে মুখ্য ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। এছাড়া অন্যান্য ছবিতে তাকে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব চরিত্রে দেখা গিয়েছে। কিন্তু সেই পার্শ্ব চরিত্রের অভিনয় করেও কিভাবে দর্শকের মন জিতে নিতে হয় সেটা খুব ভালোমতো জানতেন অভিনেতা।
তার অভিনীত জনপ্রিয় কিছু ছবির মধ্যে অন্যতম হলো অযান্ত্রিক, পরশপাথর, সোনার কাঠি, অবাক পৃথিবী, হরিশচন্দ্র, একটি রাত, পথের পাঁচালী, সাড়ে চুয়াত্তর, পন্ডিত মশাই ইত্যাদি। তার অভিনীত ছবির সংখ্যা হাতে গুনে শেষ করা যাবে না। সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে উত্তম-সুচিত্রার জুটি তুলসী চক্রবর্তী-মোলিনাদেবীর জুটির কাছেও হার মেনে ছিল। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে সেই সময় তাকে রান্নার হলুদ বলে মনে করা হতো।
জেনে নিন তুলসী চক্রবর্তীর জীবনের গল্প
সত্যজিৎ রায়ের তার বহু সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন তুলসী চক্রবর্তীকে না পেলে তিনি পরশপাথর কিভাবে বানাতেন সেটা তিনি নিজেও জানেন না।তুলসী চক্রবর্তীর জন্যই পরশ পাথর বানিয়েছিলেন তিনি। এমনকি উত্তমকুমার নিজে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তুলসী চক্রবর্তীর বেতন। বেশি বেতন পেয়ে বাড়তি টাকাটা ফেরত দিতে এসেছিলেন তুলসী। বড় মাপের অভিনেতা হওয়া সত্বেও খুবই ছাপোসা জীবন যাপন পালন করতেন তিনি। তাকে নেওয়ার জন্য স্টুডিও থেকে অনেক সময় গাড়িও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই গাড়ি তিনি ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বাসে, ট্রেনে এবং পায়ে হেঁটে চলাফেরা করতেই অভ্যস্ত ছিলেন তিনি।
তবে এত বড় একজন অভিনেতার বাল্যকাল ভীষণই কষ্টে কেটেছিল। বাবা অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে মা অথৈ জলে পড়েন। অভিনেতার বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা তাকে নিয়ে কলকাতায় আসে। প্রথমে উত্তর কলকাতার একটি দোকানে বাসনপত্র ধোয়ার কাজ করেন, তারপর সার্কাসে জোকার হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেছিলেন। এরপর কাকার হাত ধরে থিয়েটারের ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ শুরু করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন গানে, তবলায়, পাখোয়াজে। ১৯২০ সালে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ নাটকের মাধ্যমে স্টেজজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯২৭ সালে মনমোহন থিয়েটারে যুক্ত হন, তারপর মিনার্ভা, রংমহল থিয়েটারে কাজ করে প্রায় ৪২টি প্রযোজনায় অভিনয় করেছিলেন। থিয়েটারে কাজ করতে করতে বাংলা সিনেমার জগতে প্রবেশ করলেন ১৯৩২ সালে ‘পুনর্জন্ম’ ছবির মাধ্যমে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে ছবির কাজের সুযোগ আসে তার কাছে।
আরও পড়ুন: পি.আর.কের চালে ফের উল্টে গেল দুই শালিক! ছাতা বাড়িতে ফিরলো আঁখি! টানটান উত্তেজনাময় আজকের পর্ব
সারা জীবনে ৩১৬টি বাংলা ও ২৩টির মতো হিন্দি সিনেমা করলেও দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য অর্থ জোগাড় করতে হিমশিম খেয়েছেন। তারপর ১৯৬১ সালের ১১ ডিসেম্বর অনাহারে, চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয় তুলসী চক্রবর্তীর।

