গর্ভবতী অবস্থায় ঘর থেকে বিতাড়িত! সেখান থেকেই বিশ্বজয়! বিচ্ছেদ, অপমান আর লড়াইয়ের নাম ‘আশা ভোঁসলে’! শেষ হলো গায়িকার অদম্য জীবন-কাব্য!

ভারতীয় সঙ্গীত জগতের (Music Industry) এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সুরের জাদুকরী আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle) ৯২ বছর বয়সে পাড়ি দিলেন না ফেরার দেশে। গত ১২ই এপ্রিল, ২০২৬ রবিবার মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা ও বুকে সংক্রমণের কারণে তিনি বেশ কয়েকদিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় সঙ্গীত শিল্পে একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের সকল নক্ষত্ররা এই কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
আশা ভোঁসলের জীবনের শুরুটা ছিল সিনেমার গল্পের মতোই নাটকীয় এবং কঠিন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে এবং দিদি লতা মঙ্গেশকরের আপত্তিতে প্রতিবেশী গণপতরাও ভোঁসলেকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন এক সুখের সংসারের কথা, কিন্তু নিয়তি ছিল ভিন্ন। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয় স্বামীর চরম শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। এমনকি তাঁর উপার্জিত সমস্ত অর্থও কেড়ে নেওয়া হতো। ১৯০ এর দশকের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে এবং তৃতীয় সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে শেষ পর্যন্ত স্বামীর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল তাঁকে।
অন্ধকার সেই দিনগুলো থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই ছিল দেখার মতো। কোনো করুণার আশ্রয় না নিয়ে আশা জেদ করেছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। সেই সময় বলিউডে দিদি লতা মঙ্গেশকর ছিলেন রোমান্টিক গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রানী। আশাকে মূলত দেওয়া হতো সেই সব গান যা অন্য কেউ গাইতে চাইতেন না বিশেষ করে ক্যাবারে বা চটুল আইটেম সং। কিন্তু সেই গানগুলোকেই তিনি নিজের মেধা আর শ্রম দিয়ে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেন। সুরকার আর. ডি. বর্মনের (পঞ্চম দা) সাথে তাঁর সেই যুগলবন্দি বলিউডের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিল, যা পরবর্তীতে এক গভীর ভালোবাসার সম্পর্কেও রূপ নেয়।
আশা ভোঁসলে যে কেবল গানের রানী ছিলেন তাই নয়, তাঁর হাতের রান্নার জাদুও ছিল বিশ্বখ্যাত। রান্নার প্রতি তাঁর এই তীব্র ভালোবাসা থেকেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘আশাজ’ (Asha’s) নামে একটি আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁ চেইন। দুবাই থেকে শুরু করে লন্ডন পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর এই ভোজনবিলাসিতার সাম্রাজ্য। তিনি নিজে একজন দক্ষ শেফ ছিলেন এবং রেস্তোরাঁর অনেক রেসিপি ছিল তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবন। সঙ্গীত ও রন্ধনশিল্পের এই বিরল মেলবন্ধন তাঁকে সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।
View this post on Instagram
ব্যক্তিগত জীবনে হাজারো ঝড়ঝাপটা আর লড়াইয়ের পরেও আশা ভোঁসলে কোনোদিন হার মানেননি। তাঁর অদম্য জেদ এবং গানের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্লেব্যাক সিঙ্গারের সম্মান এনে দিয়েছিল। ২০ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানো এই শিল্পীর কণ্ঠ যুগে যুগে ভক্তদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে। আজ তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মধ্যে নেই ঠিকই, কিন্তু তাঁর কালজয়ী গান আর অনুপ্রেরণামূলক জীবনের কাহিনী চিরকাল নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখাবে।

