‘ঘরে খাবার ছিল না, প্রতিবেশীর থেকে চাল-ডাল চেয়েছি’, ‘আমি দুঃখ দেখাই না বলে সবাই হিং’সে করে’, কোটি কোটি মানুষকে হাসিয়েছেন যিনি, তাঁরই কপালে জুটেছে অবহেলা! টলিউডের রাজনীতি নিয়ে বি’স্ফোরক অভিনেত্রী তনিমা সেন!

বাঙালি দর্শকের কাছে তিনি এক চিরপরিচিত হাসিমুখ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নাটক, টেলিফিল্ম, মেগা সিরিয়াল থেকে শুরু করে বড় পর্দা সব জায়গাতেই নিজের অনবদ্য অভিনয় এবং স্বভাবসুলভ রসবোধ দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে হাসিয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী তনিমা সেন (Tanima Sen)। যেকোনো গুরুগম্ভীর পরিস্থিতিকে নিমেষের মধ্যে হালকা করে দেওয়ার এক অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে তাঁর অভিনয়ে। পর্দায় তাঁকে দেখা মানেই দর্শকদের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে ওঠা। কিন্তু এই সদা-হাস্যোজ্জ্বল মুখের আড়ালে যে কতটা গভীর এক জীবনসংগ্রাম এবং বিষাদের গল্প লুকিয়ে রয়েছে, তা হয়তো বহু ভক্তেরই অজানা ছিল। সম্প্রতি একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের জীবনের সেই না-বলা অন্ধকারের দিনগুলোর কথা অত্যন্ত সহজ ও অকপণ ভাষায় সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
অভিনয় জীবনের চাকচিক্য আর জনপ্রিয়তার পেছনে যে কত বড় কঠিন বাস্তব লুকিয়ে থাকে, তা তনিমা সেনের জীবনসংগ্রামের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়। সাক্ষাৎকারে নিজের অতীতের এক চরম সংকটের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, তাঁর জীবনের একটা বড় সময় গেছে যখন তাঁর হাতে কোনো কাজ ছিল না। গ্ল্যামার দুনিয়ার শিখরে থাকা একজন শিল্পীকেও যে কতটা ভয়াবহ আর্থিক অনটনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। পরিস্থিতি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, ঘরে খাবার দাবার পর্যন্ত শেষ হয়ে গিয়েছিল। অভিনেত্রী জানান, সেই চরম দুর্দিনে কাউকে নিজের কষ্টের কথা বুঝতে না দিয়ে, আত্মসম্মান বজায় রেখে পাশের বাড়ি থেকে চাল-ডাল চেয়ে এনে রান্না করতে হয়েছিল তাঁকে। পর্দার আড়ালের এই অনাহারের দিনগুলোর কথা তিনি এতদিন কাউকে জানতে দেননি, মুখ বুজে সহ্য করেছেন চরম লড়াই।
ইন্ডাস্ট্রির এক অদ্ভুত রীতিনীতি এবং মানুষের মানসিকতা নিয়েও গভীর ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন এই গুণী শিল্পী। তিনি জানান যে, জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের মাঝে চরম কষ্টের দিনগুলোতেও যখনই তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন বা মানুষের সাথে মিশেছেন, সবসময় নিজেকে হাসিখুশি রেখেছেন। কিন্তু এই হাসির পেছনে থাকা কান্নাকে মানুষ বুঝতে চায়নি। তানিমা সেন বলেন, তিনি নিজের দুঃখের কথা সহজে কাউকে বলেন না এবং সবার সামনে আনন্দের পরিবেশ তৈরি করে রাখেন বলে আশেপাশের অনেকেই তাঁকে ভুল বুঝেছেন। অনেকেই ভাবতেন তাঁর সংসারে বুঝি কোনো অভাব বা অশান্তি নেই, তাঁর জীবন ভীষণ সুখে কাটছে। আর এই ধারণা থেকেই ইন্ডাস্ট্রির ভেতর ও বাইরের বহু মানুষ তাঁর প্রতি চরম হিংসা বোধ করতেন, যা তাঁকে মানসিকভাবে ভীষণ আঘাত দিত।
টলিউডের বর্তমান কাজের পরিবেশ এবং সুযোগ পাওয়ার বৈষম্য নিয়েও এই সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন প্রবীণ এই অভিনেত্রী। বর্তমান সময়ে যেভাবে টলিউড ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে কাজের বণ্টন বা কাস্টিং করা হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, যোগ্যতার চেয়ে অন্যান্য সমীকরণ এখন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, যার ফলে তাঁর মতো প্রবীণ ও ঝানু শিল্পীদের কদর অনেকটাই কমে গেছে। অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে তিনি জানান, বর্তমানের এই লবি বা গোষ্ঠীভিত্তিক কাজ বণ্টনের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি আর নতুন কোনো ভালো কাজ পাবেন বলে আশা করেন না। ইন্ডাস্ট্রির এই উদাসীনতা এবং অবহেলা একজন জাত শিল্পীকে কতটা কোণঠাসা করে তুলতে পারে, তানিমা সেনের এই বক্তব্য তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
আরও পড়ুনঃ ‘আমার তো মা নেই, মা চলে যাওয়ার পর অন্নপূর্ণাই আমার মা…’ মা অন্নপূর্ণার রূপে ভক্তদের মুগ্ধ করলেন কনীনিকা ব্যানার্জি! আবেগঘন অভিজ্ঞতা ভাগ করলেন অভিনেত্রী!
অভিনয় জগত থেকে এমন একপ্রকার নির্বাসন বা অবহেলার শিকার হয়েও অবশ্য দমে যাননি এই লড়াকু অভিনেত্রী। পর্দার অভিনয়ের সুযোগ কমে আসায় তিনি এখন তাঁর ভেতরের অন্যতম সেরা প্রতিভা, অর্থাৎ লেখালেখির দিকে সম্পূর্ণ মন দিতে চাইছেন। চমৎকার এবং নিখুঁত লেখার এক ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা রয়েছে তাঁর, যা অতীতেও বহু গুণী মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অভিনেত্রী জানান, একঘেয়েমি, শারীরিক অসুস্থতা এবং টলিউডের এই নোংরা রাজনীতি থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে তাঁর এখন একটু দূরে কোথাও ঘুরে আসার প্রবল ইচ্ছে রয়েছে। মানসিক ক্লান্তি কাটিয়ে ফিরে এসে তিনি নিজেকে পুরোপুরি লেখার টেবিলে সঁপে দিতে চান। টলিউড তাঁকে অবহেলা করলেও, তিনি তাঁর কলমের ধার দিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন এবং নিজের শর্তেই বাকি জীবনটা কাটাবেন এটাই এখন তাঁর একমাত্র সংকল্প।

