‘আমি ধারাবাহিকে অভিনয় করিনি কারণ…’ ‘ভুল গুলোকে সবসময় মেনে নিতে হবে…’ ‘আমি লিভ-ইন করতাম, সম্পর্কটা চলেনি!’ নিজের অতীত নিয়ে অকপট সৌম্য মুখোপাধ্যায়!

টলিউডের (Tollywood) বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম প্রতিভাবান এবং চর্চিত অভিনেতা হলেন সৌম্য মুখোপাধ্যায় (Soumya Mukherjee)। ১৯৯২ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া সৌম্যর পড়াশোনা পার্ক সার্কাসের ডন বস্কো স্কুলে। স্কুল জীবন থেকেই থিয়েটারের প্রতি তাঁর টান ছিল প্রবল, যা পরবর্তীকালে কলেজে পড়তে পড়তে পেশাদার থিয়েটারে রূপ নেয়। ২০১৭ সালে ‘হোলি ফাক’ ওয়েব সিরিজের হাত ধরে ডিজিটাল মাধ্যমে তাঁর পথচলা শুরু। এরপর ‘কুছ ভিগে আলফাজ’, অনীক দত্তর ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ এবং অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের ‘প্রেম টেম’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মন কেড়ে নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে রানি মুখার্জীর সঙ্গে বলিউড ছবি ‘মিসেস চ্যাটার্জী ভার্সেস নরওয়ে’, ‘চিনি ২’ এবং অ্যাকশন ঘরানার ছবি ‘প্যারায়া’-এ তাঁর কাজ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর অবস্থানকে আরও মজবুত করেছে। থিয়েটারের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা এই অভিনেতা সিনেমা ও ওটিটি স্ক্রিনে বারবার নিজেকে ভাঙতে ও গড়তে ভালোবাসেন।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের এক চরম সত্য এবং বিতর্কিত অধ্যায় নিয়ে মুখ খুলেছেন সৌম্য। টলিপাড়ার এই হ্যান্ডসাম অভিনেতা জানান, তিনি তাঁর জীবনের একটি দীর্ঘ সময় তৎকালীন বান্ধবীর সাথে লিভ-ইন রিলেশনশিপে (সহবাস) ছিলেন। বর্তমান সমাজে লিভ-ইন সম্পর্ক নিয়ে নানা ছুঁতমার্গ ও বিতর্ক থাকলেও, সৌম্য কোনো রাখঢাক না রেখেই স্বীকার করেন যে সেই সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত টেকেনি। সম্পর্কের ভাঙন প্রসঙ্গে কোনো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি না করে অত্যন্ত পরিণত মানসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, জীবনে বা কাজে কোথাও ভুল থাকলে সেটা নিজের কাঁধেই নেওয়া উচিত। তাঁর মতে, হয়তো তাঁদের বোঝাপড়ায় ভুল ছিল, ঠিক যেমন অভিনয়ে, গানে বা লেখাতেও ভুল থাকতে পারে। এই খোলামেলা স্বীকারোক্তিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই বেশ চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
কেরিয়ার ও অভিনয় জগৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ছোটপর্দা বা মেগা সিরিয়াল থেকে নিজের দূরত্ব বজায় রাখার কারণ স্পষ্ট করেছেন সৌম্য, যা অভিনেতা মহলে বেশ কৌতূহল ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কেন তাঁকে কোনো প্রথম সারির ধারাবাহিকে দেখা যায় না? এই প্রশ্নের উত্তরে সৌম্য সোজাসুজি জানান, মেগা সিরিয়ালে অভিনয় না করার কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা জটিল কারণ নেই। আসল কারণ হলো, তিনি প্রতিটি প্রজেক্টে এবং প্রতিটি চরিত্রে নিজের রূপ বা ‘লুক’ পরিবর্তন করতে ভালোবাসেন। মেগা সিরিয়ালের দীর্ঘস্থায়ী ও একঘেয়ে চরিত্রের বাঁধনে আটকে থাকলে একজন অভিনেতার পক্ষে বারবার চেহারা ও অভিনয়ের ধরন বদলে ফেলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চরিত্রের খাতিরে এই স্বাধীনতাটুকুর জন্যই তিনি মেগা সিরিয়ালের বড় বড় অফার থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন।
টলিউড এবং বলিউডের কাজের সংস্কৃতির মধ্যে একটি বড় খামতি বা পার্থক্যের কথা তুলে ধরে ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের এক বিতর্কিত সত্যকে সামনে এনেছেন সৌম্য। মুম্বাই বা বলিউডে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, সেখানে প্রতিটি ছোট-বড় চরিত্রের জন্য নিয়ম মেনে কঠোর অডিশন প্রসেসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু টলিউড বা কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এই অডিশন কালচারটা অত্যন্ত কম, যা কাজের মান ও নতুন প্রতিভাদের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। সৌম্যর মতে, কলকাতায় অডিশনের চেয়ে পরিচিতি বা সম্পর্কের সমীকরণ অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়, যা কাজের পেশাদারিত্বকে কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করে। বম্বে বা বলিউডের এই নিয়মতান্ত্রিক অডিশন প্রসেস কলকাতার ইন্ডাস্ট্রিরও দ্রুত আপন করে নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন: মাঝ আকাশে প্যারাসুটে সম্রাটের বার্থডে সারপ্রাইজ! ঝিনুকের জন্মদিনে বিরাট কান্ড ঘটালো সম্রাট! দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
জীবনের রিল লাইফ এবং রিয়েল লাইফের টানাপোড়েনের মাঝে সৌম্য তাঁর জীবনের এক গভীর পারিবারিক ট্র্যাজেডির কথাও ভাগ করে নেন, যা দর্শকদের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে। ২০১৪ সালে একটি ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় সৌম্য তাঁর নিজের দাদাকে হারান। সেই আকস্মিক বিপর্যয় তাঁর পরিবারকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছিল। একদিকে থিয়েটার ও কেরিয়ার গড়ার লড়াই, অন্যদিকে প্রিয়জনকে হারানোর মানসিক যন্ত্রণা এই দুইয়ের মধ্য দিয়েই তিনি আজকের অবস্থানে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। সাক্ষাৎকারের শেষে সিনিয়র তারকাদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি জানান, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিনেত্রীদের সাথে ফ্রেম শেয়ার করার আগে তিনি কতটা নার্ভাস থাকেন। কেরিয়ারে কোনো পুরস্কারের চেয়েও সিনিয়র শিল্পীদের স্নেহ এবং তাঁদের সাথে স্ক্রিন শেয়ার করতে পারাটাই তাঁর কাছে জীবনের সবথেকে বড় প্রাপ্তি।

