‘বাড়ির বউদের চাকরি করা চলবে না!’ ‘ মুখ ঝামটা খেয়ে কেঁদেছি, তাও বলেছি কাজ আমি করবই!’ শ্বশুরমশাইয়ের কড়া আপত্তি! হাজারো বাধা অগ্রাহ্য করে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অভিনেত্রী শাস্বতী গুহঠাকুরতা!

বাংলা টেলিভিশন জগতের (Bengali Television) অত্যন্ত পরিচিত এবং ভালোবাসার এক নাম শাস্বতী গুহঠাকুরতা (Shaswati Guhathakurata)। তাঁর মিষ্টি গলার আওয়াজ আর সুন্দর করে কথা বলার ধরণ দশকের পর দশক ধরে বাঙালি দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছে। দূরদর্শনের সোনালী যুগে তিনি ছিলেন অন্যতম জনপ্রিয় সংবাদ পাঠিকা এবং উপস্থাপক। ১৯৭৫ সালে যখন কলকাতায় প্রথম দূরদর্শন চালু হয়, তখন থেকেই তিনি অ্যানাউন্সার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বছর সেখানে চাকরি করেছেন। তবে শুধু খবর পড়াই নয়, ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি ছোটপর্দায় সিরিয়াল, সিনেমা এবং নাটকেও অভিনয় শুরু করেন। ‘কুসুম দোলা’, ‘ইষ্টি কুটুম’, ‘ইচ্ছে পুতুল’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিয়ালের পাশাপাশি ‘এবার শবর’ বা ‘জেএল ৫০’-এর মতো সিনেমা ও ওয়েব সিরিজেও তিনি অভিনয় করেছেন। শান্তিনিকেতনে বেড়ে ওঠার কারণে গান ও নাচেও তাঁর দারুণ পারদর্শীতা ছিল এবং আকাশবাণীর রেডিওতে তিনি নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন।
ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর স্বভাবের এই মানুষটিকে খুব একটা ইন্টারভিউতে দেখা যায় না। সম্প্রতি তিনি একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যা রেকর্ড করতে প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছে। আড্ডার শুরুতে তিনি জানান, প্রচারের আলোয় থাকার চেয়ে নিজের মতো থাকতেই তিনি বেশি ভালোবাসেন। দূরদর্শনের শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি বলেন, তখন তিনি কলেজে এম.এ পড়ছেন। হঠাৎ করেই প্রথম ডিরেক্টর মীরা মজুমদারের নজরে আসেন এবং দূরদর্শনে কাজ পেয়ে যান। সে সময়ের জনপ্রিয়তার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তখন আজকের মতো সেলিব্রিটি কোনো অহংকার ছিল না। যেহেতু তাঁরা প্রতিদিন সরাসরি মানুষের বসার ঘরে টিভির পর্দায় হাজির হতেন, তাই মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের ঘরের মেয়ে বা বাড়ির একজন সদস্যের মতোই আপন করে নিয়েছিল।
তবে এই সফল ক্যারিয়ারের পেছনে ছিল তাঁর এক বড় ব্যক্তিগত লড়াই। শাস্বতী দেবীর বাপের বাড়ি পড়াশোনার পরিবেশ হলেও, মাত্র ২০ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় এক বড় যৌথ ব্যবসায়ী পরিবারে। সেই পরিবারে বাড়ির বউদের চাকরি করা একেবারেই পছন্দ করা হতো না। ১৯৭৫ সালে যখন তিনি দূরদর্শনে চাকরি পান, তখন তাঁর মেয়ে শ্রেয়া মাত্র কয়েক মাসের শিশু। তাঁর শ্বশুরমশাই ছিলেন সেই বড় পরিবারের একমাত্র প্রধান এবং দাপুটে অভিভাবক, যিনি কোনোভাবেই বউমার এই চাকরি মেনে নিতে পারেননি। ১৯৭৫ থেকে শুরু করে ১৯৮৯ সালে শ্বশুরমশাইয়ের মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছর তীব্র পারিবারিক আপত্তি ও মানসিক ঝড়-ঝাপটা সহ্য করতে হয়েছে শাস্বতী দেবীকে। কিন্তু কোনো দিন পরিবারের কারও সাথে ঝগড়া বা চেঁচামেচি না করেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। বকুনি খেয়ে কেঁদেছেন, শাশুড়ি মায়ের থেকে গোপনে আদর ও সমর্থন পেয়েছেন, কিন্তু মুখ বুজে নিজের কাজটা করে গেছেন।
বর্তমান বিনোদন জগতের নানা পরিবর্তন এবং টলিউডের ভেতরের রাজনীতি নিয়েও এই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্ট কথা বলেছেন প্রবীণ এই অভিনেত্রী। তিনি মনে করেন, আজকালকার ছেলেমেয়েরা ভালো করে অভিনয় শেখার বা বোঝার আগেই রাতারাতি প্রচুর টাকা আর সস্তা জনপ্রিয়তার হাতছানি পেয়ে যায়। এই হুট করে পাওয়া সাফল্য অনেক সময়ই তরুণদের মাথা ঘুরিয়ে দেয়, যা একেবারেই ভালো নয়। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া বা ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ার দেখে অভিনেতা-অভিনেত্রী বাছা হয় শুনেও তিনি অবাক হন। টলিউডের অন্দরে রাজনীতির রঙ লেগে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক সময় শিল্পীরা বাধ্য হয়ে বা নিজের সুবিধার জন্য ক্ষমতার রঙ মাখেন। তিনি চান বিনোদন জগতের মানুষেরা যেন রাজনীতির বাইরে থেকে শুধু নিজেদের কাজটাই ভালোবেসে করেন এবং বাইরের কোনো শক্তি যেন এই জগতটাকে নিয়ন্ত্রণ না করে।
আরও পড়ুনঃ ‘আমার সদ্যজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে…’ ‘চরম অপমান সহ্য করেছি!’ ‘উপায় ছিল না, মুখ বুজে সহ্য করেছি!’ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি কাঁপিয়ে দিল বিনোদন জগৎ!
জীবনের ৭০ বছর বয়সে এসেও শাস্বতী গুহঠাকুরতার জীবন দর্শন এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের পা সবসময় মাটিতে থাকা উচিত এবং অহংকার ভুলে সবসময় নতুন কিছু শেখার মানসিকতা রাখা দরকার। বর্তমানে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের জনসংযোগ বা কথা বলার ক্লাস নেন। হাসতে হাসতে তিনি জানান, এই বয়সে এসেও তাঁর এআই সম্পর্কে জানার প্রবল ইচ্ছে এবং তিনি তাঁর নিজের তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকেই এই যুগের নতুন নতুন প্রযুক্তি শিখে নেন। সবশেষে, বর্তমানের মেগা সিরিয়ালের জাঁতাকল নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আজকের দিনে প্রতিদিনের এপিসোড নামানোর জন্য শিল্পীদের যেভাবে টানা ১৪-১৫ ঘণ্টা খাটতে হয়, সেখানে ভালো অভিনয় করার বা নতুন কিছু করার কোনো সুযোগ থাকে না। তাই তিনি চান, টিআরপির চক্কর থেকে বেরিয়ে বাংলায় আবারও সুস্থ, সুন্দর ও শিক্ষামূলক কাজ তৈরি হোক।

