‘মানিয়ে নিতে পারলেই সুখ, না মানলেই রাগ আর দুঃখ!’ আশির দশকের গ্ল্যামার থেকে শুরু, কবিতার খাতায় শেষ! শকুন্তলা বড়ুয়ার অন্দরমহলের অজানা কথা!

বাংলা চলচ্চিত্র (Tollywood) ও টেলিভিশন জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র শকুন্তলা বড়ুয়া (Shakuntala Barua)। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে আপামর বাঙালির মনে জায়গা করে নিয়েছেন। ৩৫০-এর বেশি চলচ্চিত্র এবং অসংখ্য জনপ্রিয় ধারাবাহিকে অভিনয় করা এই প্রবীণ অভিনেত্রী আজও তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বাচনভঙ্গিতে সমান অমলিন। বর্তমানে তিনি পর্দার ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও, নিজের সৃজনশীলতা এবং পরিবারের সান্নিধ্যে এক চমৎকার অবসর জীবন যাপন করছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনের ফেলে আসা দিন, বর্তমান জীবনদর্শন এবং এক অজানা কবিসত্তাকে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই উঠে আসে তাঁর বর্তমান ঠিকানার কথা। শকুন্তলা দেবী জানান, তাঁর এই বসতভিটা বা ফ্ল্যাটটি আসলে একটি বহুমূল্য বিয়ের উপহার। ১৯৬৬ সালে বিয়ের সময় তাঁর বড় ননদাই তাঁর স্বামীকে এই ফ্ল্যাটটি উপহার দিয়েছিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই ছাদের নিচেই তাঁর জীবনের বহু চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষী থেকেছেন তিনি। ঘরভর্তি স্মৃতি, পুরনো আসবাব আর দেওয়ালে টাঙানো মহানায়ক উত্তম কুমারের ছবির মাঝে তিনি খুঁজে পান এক শান্তিময় আশ্রয়। এমনকি তাঁর মেয়ের প্রতি ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, কালই তাঁর মেয়ে তাঁর জন্য একটি নতুন গাড়ি কিনে পাঠিয়েছেন।
আরও পড়ুন: পর্দার সেই চঞ্চল হাসি, আড়ালে সন্তান হারানোর শোক! জেনে নিন রূপালি পর্দার পেছনে থাকা মৌসুমী চ্যাটার্জীর য’ন্ত্রণাময় জীবন কাহিনী!
অভিনয় জীবনের কথা বলতে গিয়ে অভিনেত্রী কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি জানান, সাড়ে তিনশ’র বেশি ছবিতে কাজ করার সুবাদে কত শত নায়ক এবং সহকর্মীর সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে যীশু দাশগুপ্তের মতো পরিচালকের সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্বের কথা তিনি স্মরণ করেন। তবে বর্তমানের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি এবং সিরিয়াল করার ধরণ যে আমূল বদলে গেছে, তা তিনি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, আগের মতো সেই পারিবারিক টান বা ঘনিষ্ঠতা এখনকার কর্মক্ষেত্রে অনেকটা কম। তবুও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধিকে তিনি ইতিবাচক ভাবেই দেখেন।
পর্দার বাইরে শকুন্তলা বড়ুয়ার এক অন্য পরিচয় হলো তাঁর কবিসত্তা। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি ছড়া বা পদ্য লিখতেন। বিয়ের পর তাঁর এই প্রতিভা আরও বিকশিত হয়। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘কুরুক্ষেত্রে কাঁদে ভালোবাসা’ পাঠক মহলে সমাদৃত হয়েছিল। এমনকি তাঁর মেয়ের শৈশবকে ধরে রাখতে তিনি ‘মগলির খর্চা’ নামে একটি ছড়ার বই প্রকাশ করেছিলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর লেখা ‘মেঘলা প্রেম’ এবং ‘নামকরণ’ নামক দুটি কবিতা পাঠ করেন। বিশেষ করে ‘নামকরণ’ কবিতাটির গভীরতা এবং হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে থাকা এক বেওয়ারিশ লাশের আকুতি দর্শকদের মনে এক গভীর রেখাপাত করে।
পরিশেষে, বর্তমান সমাজ এবং প্রজন্মের পরিবর্তন নিয়ে এক আধুনিক জীবনদর্শনের কথা শোনালেন এই বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। লিভ-ইন রিলেশনশিপ বা আধুনিক যুগের নানা সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, যুগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলেই মানুষ সুখে থাকতে পারে। নিজের নাতি-নাতনিদের সাফল্য এবং তাঁদের স্বাধীনচেতা মানসিকতাকে তিনি শ্রদ্ধা করেন। তাঁর মতে, সন্তানদের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে তাঁদের পাশে থাকাই প্রকৃত অভিভাবকের কাজ। বর্তমানে নাতি-নাতনি ভরা সংসার আর কবিতা চর্চার মাধ্যমেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন তাঁর আধ্যাত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি।

