‘ভয় পেয়ে রাজনীতিতে আসার তত্ত্ব মানতে নারাজ,’ ‘মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে সরাসরি ‘না’ বলেছিলাম, ভয়ের কোনো জায়গাই নেই!’ রাজনীতি ও টলিউড প্রসঙ্গে অকপট ঋত্বিক চক্রবর্তী!

টলিউডের (Tollywood) অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা তিনি। পর্দায় তাঁর অভিনয় যেমন দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে, বাস্তব জীবনেও তাঁর সোজাসাপ্টা কথা ঠিক ততটাই নজর কাড়ে। আগামী ২৯শে মে মুক্তি পেতে চলেছে পরিচালক পৃথা-র নতুন ছবি ‘ফেরা’। এই ছবিতেই এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যাবে ঋত্বিক চক্রবর্তীকে (Ritwick Chakraborty)। সম্প্রতি এই ছবির প্রচারের মাঝেই এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের আগামী ছবি, টলিউডের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিং এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এক্কেবারে খোলামেলা আড্ডায় মাতলেন অভিনেতা। রাজনীতি থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন কোনো কিছু নিয়েই মন্তব্য করতে পিছপা হননি তিনি।
টলিউড এবং রাজনীতির সমীকরণ নিয়ে ইদানীংকালে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে স্টুডিও পাড়ায়। অনেক সময়ই অভিযোগ ওঠে, ক্যারিয়ারের ক্ষতি বা ভয়ের কারণে শিল্পীরা শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য হন। তবে ঋত্বিক এই ‘ভয়’ পাওয়ার তত্ত্বকে পুরোপুরি খণ্ডন করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, বিগত ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে মাত্র একবার কোনো এক মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য তাঁর কাছে ডাক এসেছিল। তিনি কোনো দ্বিধা না রেখে সরাসরি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। অভিনেতা জানান, এর জন্য তাঁর কর্মজীবনে কোনো সমস্যা হয়নি এবং দ্বিতীয়বার কেউ তাঁকে জোরও করতে আসেনি। তাঁর মতে, যাঁরা রাজনীতিতে যোগ দেন বা দলের কাছাকাছি যান, তাঁরা অনেকেই নিজেদের ইচ্ছেতে বা কোনো না কোনো রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আসায় যান। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো যেমন শিল্পীদের ব্যবহার করে, শিল্পীরাও নিজেদের স্বার্থ খুঁজে নেন। দলবদলের এই খেলাকে তিনি স্রেফ একটি ‘উদ্ভট পরিস্থিতি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে নতুন সরকারের আমলে যেন টলিউড পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
রাজনীতির আঙিনা পেরিয়ে ঋত্বিক কথা বললেন তাঁর আগামী ছবি ‘ফেরা’ এবং সেখানে তাঁর ফুটিয়ে তোলা চরিত্রটি নিয়ে। ছবিতে এক ৪২ বছর বয়সী মধ্যবিত্ত যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। চরিত্রটির অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বর্তমান সমাজের এক জ্বলন্ত বাস্তবকে তুলে ধরে। ঋত্বিক জানান, পড়াশোনা শেষ করে প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করার পরেও কলকাতার মতো শহরে একটা নিজের ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য হয়ে ওঠেনি তাঁর চরিত্রের। এমনকি নিজের পৈত্রিক বাড়িটি মেরামতের জন্য যদি হঠাৎ এক লাখ টাকার প্রয়োজন হয়, তবে সেই মধ্যবিত্ত যুবক মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ও না-পাওয়ার গল্পটি আমাদের চারপাশের অসংখ্য চেনা মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। ছবিতে ঋত্বিকের পাশাপাশি ভারতের প্রখ্যাত অভিনেতা সঞ্জয় মিশ্র সহ সোহিনী, সুব্রত দত্ত ও প্রিয়াঙ্কাকে দেখা যাবে।
পর্দার বাইরে ঋত্বিক চক্রবর্তী মানুষ হিসেবে কেমন, তা জানতেও উৎসুক থাকেন অনুগামীরা। অভিনেতা জানান, বাস্তব জীবনে তিনি নিজেকে খুব গুটিয়ে রাখতেই পছন্দ করেন। তাঁর জীবনে জবাবদিহি করার মতো মানুষের সংখ্যা বড়জোর দু-তিন জন, তাই বাকি দুনিয়া বা সমাজ তাঁকে নিয়ে কী ভাবল, তা নিয়ে তিনি একেবারেই চিন্তিত নন। বর্তমান যুগের সোশ্যাল মিডিয়া ট্রোলিং নিয়েও তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই। তিনি ফেসবুকে কাউকে জবাবদিহি করতে যান না, তবে মাঝে মাঝে স্রেফ সময় কাটানোর জন্য বা মজা নেওয়ার খাতিরে ট্রোলের অদ্ভুত সব উত্তর দিয়ে থাকেন। নিজের জীবনের অতীত সংগ্রাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্বীকার করেন, আজ তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তা তাঁর পরিবারের দেওয়া স্বাধীনতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। কারণ তাঁর স্ট্রাগলের দিনগুলোতে পরিবারের তরফ থেকে কোনো আর্থিক চাপ ছিল না। তবে সেই কঠিন লড়াইয়ের দিনগুলোতে তিনি আর কোনোদিন ফিরে যেতে চান না।
আরও পড়ুনঃ ‘অনেক হয়েছে আর সহ্য করব না…’ ‘এমন অভদ্র অসভ্য ব্যবহার, তেড়ে আসছে আমার দিকে…’ ইমপা অফিসে চরম উত্তেজনা! বৈঠকের আগেই বচসা! অপমানের অভিযোগ তুলে আইনি পথে পথে পিয়া সেনগুপ্ত!
একজন পিতা হিসেবেও ঋত্বিকের চিন্তাভাবনা বেশ আধুনিক এবং শিক্ষণীয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেখানে মা-বাবারা সন্তানের সমস্ত আবদার মুহূর্তের মধ্যে পূরণ করে দিতে ব্যস্ত, সেখানে ঋত্বিক হাঁটছেন উল্টো পথে। তিনি জানান, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ছেলের ১০০টি আবদারের মধ্যে বড়জোর ৮০টি পূরণ করেন, বাকি ২০টি ইচ্ছে করেই অপূর্ণ রেখে দেন। অভিনেতার মতে, সন্তানদের ছোট থেকেই ‘না’ শোনার অভ্যাস করা উচিত। জীবনের শুরুতেই যদি সমস্ত কিছু সহজে পেয়ে যাওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে কোনো বড় ধাক্কা বা না-পাওয়া এলে তা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সন্তানকে বাস্তববাদী করে গড়ে তুলতেই এই বিশেষ প্যারেন্টিং পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন তিনি। পরিশেষে, বাঙালি জীবনের সুখ-দুঃখ এবং এক বাবা-ছেলের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে তৈরি ‘ফেরা’ সিনেমাটি দর্শকদের ভালো লাগবে বলেই আশাবাদী ঋত্বিক এবং আগামী ২৯শে মে সকলকে সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

