‘ছেলের কথাতেই সহজ কথার জন্ম, ওর নামেই চ্যানেলের নাম’ ‘আমি লিখলে সেটা পাঠানোর দায়িত্ব সহজের!’ ডিজিটাল দুনিয়ায় ছেলের হাতেই হয়েছিল বাবার হাতে খড়ি! সেই চ্যানেলই আজ রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ স্মৃতি!

টলিউডের (Tollywood) অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বলিষ্ঠ অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) অকাল প্রয়াণ বিনোদন জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। গত ২৯শে মার্চ ২০২৬, ওড়িশার তালসারিতে শুটিং চলাকালীন এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। একটি নতুন ধারাবাহিকের শুটিংয়ের জন্য তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। নাচের একটি দৃশ্য ধারণ করার সময় হঠাৎই ভারসাম্য হারিয়ে তিনি দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে গোটা টলিপাড়া স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুরাগীদের শোকবার্তায় ছেয়ে গেছে।

রাহুলের মৃত্যুর ঠিক দুদিন পরেই নেট দুনিয়ায় নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তাঁর ইউটিউব চ্যানেল ‘সহজ কথা’-র একটি পুরনো ভিডিও। যেখানে দেখা যাচ্ছে অভিনেতা অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে তাঁর জীবনের নতুন এক স্বপ্নের কথা বলছেন। অভিনেতার মৃত্যুর পর এই ভিডিওটি এখন ভাইরাল হওয়ার মূল কারণ হলো, এতে রাহুলের কেবল একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং একজন স্নেহপ্রবণ বাবা এবং এক অতি সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর সেই হাসিমুখের কথাগুলো এখন অনুরাগীদের কাছে এক বিষাদময় স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে, যা দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না কেউ।

এই ভিডিওটিতে রাহুল অত্যন্ত সহজভাবে স্বীকার করেছেন যে, আধুনিক প্রযুক্তি বা ডিজিটাল দুনিয়ার সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল বেশ জটিল। তিনি নিজেকে ‘টেকনিক্যালি চ্যালেঞ্জড’ বলে মজা করে জানিয়েছেন যে, লোকেশন পিন পাঠাতে বললে তিনি লিখে দিতেন স্রেফ ‘কলকাতা ৩২’। এমনকি তাঁর বিভিন্ন নামী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার জন্য যে লেখাগুলো তৈরি হতো, সেগুলো মেইল করার ক্ষমতাটুকুও তাঁর ছিল না। কন্ট্রোল এ, বি বা সি—কিবোর্ডের এই ছোটখাটো কারিকুরিগুলো তাঁর কাছে ছিল এক গোলকধাঁধার মতো। কিন্তু এই পুরো যান্ত্রিক দিকটি সামলে নিত তাঁর প্রাণের চেয়েও প্রিয় পুত্র সহজ।

আসল কথা হলো, এই ‘সহজ কথা’ পডকাস্ট চ্যানেলটির জন্মই হয়েছিল তাঁর ছেলে সহজের অনুপ্রেরণায়। ছেলেই তাঁকে বারবার অনুরোধ করেছিল নিজের একটি পডকাস্ট শুরু করার জন্য এবং বাবার সৃজনশীলতাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরার জন্য। রাহুল তাঁর ভিডিওতে জানিয়েছিলেন যে, ছেলের কথাতেই তিনি এই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এমন মানুষদের নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন যাদের হয়তো গ্ল্যামার দুনিয়ায় অনেক ফলোয়ার নেই, কিন্তু যাদের জীবনে অনেক না বলা গল্পের রসদ আছে। তিনি চেয়েছিলেন এক প্রকৃত আড্ডার আসর বসাতে, যেখানে গল্পের মানুষরাই হবে প্রধান আকর্ষণ।

আরও পড়ুনঃ শুরু হলো জীবনের কঠিন ‘সার্ভাইভাল গেম’! শিরিনের চালে ধ্বংসের মুখে পারুলের পরিবার! কে জিতবে এই খেলায়? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব!

আজ রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সেই ‘সহজ কথা’ বাঙালির ড্রয়িংরুমে এক নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে এসেছে। যে মানুষটি নিজের জীবনের জটিলতাগুলোকে গল্পের ছলে সহজ করে বলতেন, তাঁর জীবনের গল্পটিই যে এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। ছেলের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে যে ডিজিটাল যাত্রা তিনি শুরু করেছিলেন, তা আজ এক অসমাপ্ত কাব্য হয়ে রয়ে গেল। টলিউড একজন দক্ষ অভিনেতাকে হারাল ঠিকই, কিন্তু বাঙালির স্মৃতিতে তিনি আজীবন থেকে যাবেন সেই মানুষটি হিসেবে, যিনি প্রযুক্তি না বুঝলেও মানুষের মনের ভাষাটা ঠিকই পড়তে জানতেন।

Back to top button