‘যেদিন রাতে ও মা’রা যায়, সেদিন কলকাতায় ফিরে আমার মনে একটা আশঙ্কা তৈরি হয়, যদি…’, ‘ওর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল না ঠিকই তবে…’ অম্বরিশ ভট্টাচার্যের বি’স্ফোরক বয়ানে কাঠগড়ায় প্রযোজনা সংস্থা!

জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে। ওড়িশার তালসারিতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের আউটডোর শুটিং চলাকালীন এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। অভিযোগ উঠেছে যে, উত্তাল সমুদ্র এবং চোরাবালির প্রবল ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কোনো রকম প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়াই শুটিং চালিয়ে যাচ্ছিল সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা সংস্থা। স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে বিপদের আগাম সতর্কতা দেওয়া হলেও সুরক্ষা বিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুটিং করার ফলেই এই বিপর্যয় বলে সরব হয়েছেন শিল্পীদের একাংশ। এই ঘটনায় শুধুমাত্র একজন প্রতিভাবান অভিনেতাকে হারানোই নয়, বরং স্টুডিওর অভ্যন্তরীণ ও বহিরাঙ্গন শুটিংয়ের পরিকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়েও বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।
এই শোকাবহ ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিনেতা অম্বরিশ ভট্টাচার্য এক অত্যন্ত সাহসী ও আবেগঘন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ম্যাজিক মোমেন্টস প্রযোজনা সংস্থার সাথে তিনি ভবিষ্যতে আর কোনো কাজ করবেন না। অম্বরিশ জানান, যে স্টুডিওর করিডর এবং মেকআপ রুমে রাহুলের সাথে তার দীর্ঘদিনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেখানে ফিরে গিয়ে কাজ করার মতো মানসিক স্থিতি তার নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাহুল মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা একসঙ্গেই ছিলেন এবং আগামী দিনের অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন। অম্বরিশের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে টলিউডের বহু শিল্পী ও কলাকুশলী এখন কাজের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত নিরাপত্তার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন।
রাহুলের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার ইতিমধ্যেই ওড়িশার তালসারি মেরিন থানায় এবং কলকাতার রিজেন্ট পার্ক থানায় প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের করেছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুর্ঘটনাটি ঘটার পর থেকে প্রযোজনা সংস্থা আসল সত্য আড়াল করার চেষ্টা করছে এবং রাহুলের ওপর দায় চাপিয়ে একটি ‘মিথ্যা ন্যারেটিভ’ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে, শুটিংয়ের জন্য নির্ধারিত স্থানে ড্রোন ব্যবহার বা অভিনেতা-টেকনিশিয়ানদের সুরক্ষার জন্য কোনো লাইফ-জ্যাকেট বা উদ্ধারকারী দলের ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি শুটিং ফ্লোরে ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামও অনেক সময় থাকে না বলে অভিযোগ করেছেন প্রিয়াঙ্কা ও ইন্ডাস্ট্রি ফোরামের সদস্যরা।
এই ঘটনার প্রতিবাদে ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার্স আর্টিস্ট ফোরাম এবং ফেডারেশন অফ সিনেমা টেকনিশিয়ান্স সম্মিলিতভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘কর্মবিরতি’র ডাক দিয়েছে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, অনির্বাণ ভট্টাচার্য সহ প্রথম সারির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এই আন্দোলনে সামিল হয়ে দাবি তুলেছেন যে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেফটি বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত সঠিক গাইডলাইন তৈরি হবে এবং দোষীরা শাস্তি পাবে, ততক্ষণ শুটিং বন্ধ থাকবে। তাদের মতে, কোনো শৈল্পিক সৃজনশীলতাই একজন মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। এই আন্দোলনের ফলে টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় বর্তমানে সব ধরণের মেগা সিরিয়াল এবং সিনেমার কাজ স্থগিত হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ‘অভাব কাকে বলে সেটা বাচ্চা পেটে দেখেছি…’ ‘ওই অবস্থাতেও তিন মাস পারিশ্রমিক দেয়নি…’ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় জোটেনি পারিশ্রমিক! নাম না করে লীনা গাঙ্গুলী সহ ম্যাজিক মোমেন্টসকে বিঁধলেন কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়!
বর্তমানে ওড়িশা পুলিশ এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের যৌথ উদ্যোগে এই রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত চলছে। বিশেষ তদন্তকারী দল ড্রোন ফুটেজ এবং স্থানীয় সাক্ষীদের বয়ান খতিয়ে দেখছে। রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আত্মবলিদান যেন বাংলা টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে উঠে এসেছে। ইন্ডাস্ট্রি এখন একটি সুষ্ঠু সমাধানের অপেক্ষায়, যেখানে ভবিষ্যতে আর কোনো শিল্পীকে কেবল পেশাদারী দায়বদ্ধতার খাতিরে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে না হয়। রাহুলের পরিবার এবং তার সহকর্মীরা এখন কেবল একটিই প্রত্যাশা নিয়ে দিন গুনছেন আর তা হলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আসল অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং মৃত অভিনেতার জন্য ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করা।

