‘আমার সদ্য যা তোর সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে…’ ‘চরম অপমান সহ্য করেছি!’ ‘উপায় ছিল না, মুখ বুজে সহ্য করেছি!’ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি কাঁপিয়ে দিল বিনোদন জগত!

বাঙালি মননে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় (Parambrata Chatterjee) কেবল একজন দক্ষ অভিনেতা বা পরিচালক নন, বরং একজন স্পষ্টবক্তা ও সামাজিকভাবে সচেতন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক এবং মহাশ্বেতা দেবীর পারিবারিক উত্তরসূরি পরমব্রতর রাজনীতি সচেতনতা বরাবরই সুষ্পষ্ট। দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় দলীয় রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চললেও, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে এক বড়সড় মোড় দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক স্তরে সরকারের পাশে থাকার পর, সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) নির্বাচনী জনসভায় তাঁর উপস্থিতি এবং শাসকদলের পক্ষে প্রচারের ময়দানে নামা রাজ্য রাজনীতি ও বিনোদন জগতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরমব্রত বরাবরই বিশ্বাস করেন যে, সরাসরি কোনো দলে যোগ না দিলেও সমাজ ও রাজনীতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা যায় না। তবে সক্রিয় রাজনীতির মঞ্চে পা রাখার পর তাঁর এই নতুন রাজনৈতিক সত্ত্বা এবং ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের সমীকরণকে তিনি কীভাবে দেখছেন, তা নিয়ে অনুরাগীদের কৌতূহল ছিল দীর্ঘদিনের।

ক্যামেরার সামনে অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষের পাশে বসে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় বিনোদন জগতের এক চরম অন্ধকার ও নির্মম সত্যকে সামনে এনেছেন। ভিডিওতে পরমব্রত অত্যন্ত আবেগঘন ও স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইন্ডাস্ট্রির এই ব্যান কালচার সংস্কৃতির কারণে তিনি অতীতে কতটা অসহায় বোধ করেছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে অভিনেতা বলেন, “আমার শত্রু, আমার শত্রুজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁতের দাঁত চেপে ওই জিনিসটা করেছিলাম। বাকিদের আরো অনেকে ছিলেন, তাদের অনেক আগেই তাদেরকে সকলে জানেন, এটা লোকবার কিছু নেই।”

তিনি আরও যোগ করেন, “তাদের সকলকে অনেকেই বাধ্য হয়ে, প্রত্যেকেই আমরা আমাদের রোজগার করতে হয়, আমাদেরও করতে হয়। আমাদের প্রত্যেককেই কম্প্রমাইজ করতে হয় কিছু না কিছু, কোনো না কোনো স্টেজে আমাকেও করতে হয় একটা স্টেজে এসে।” পরমব্রত অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন যে, সেই কঠিন সময়ে চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নিজের এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল মানুষের রুটি-রুজির টানে তিনি ওই নির্মম আপস করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমার শুধু আমার শত্রুজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দাঁতের দাঁত চেপে ওই জিনিসটা করেছিলাম, আমার কোনো উপায় ছিল না।” তবে তিনি এও স্পষ্ট করে দেন যে, এটি কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভপ্রকাশের জায়গা নয়, “আমি কারোর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিষোদ্গারের জন্য এখানে আসিনি। আমি কারোর বিরুদ্ধে व्यक्तिगत রাগও পেশ করতে চাই না। কিন্তু আপনাদেরকে যেহেতু বাড়ির লোক ভাবি, সেজন্য এই ব্যক্তিগত অপমানের কথাটা আপনাদের সঙ্গে জাস্ট শেয়ার করলাম।” সবশেষে তিনি তাঁর আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বলেন, “আমার বক্তব্য হচ্ছে এরকম পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়।”

পরমব্রতর এই বিস্ফোরক বয়ান টলিউডের অন্দরে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ‘ব্যান কালচার’ বা অঘোষিত বয়কটের সংস্কৃতির দিকেই সরাসরি আঙুল তোলে। বিনোদন জগতে যখন কোনো শিল্পী বা কলাকুশলী ক্ষমতার অলিন্দে থাকা নির্দিষ্ট কোনো সমীকরণের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন প্রায়শই তাঁদের কাজ কেড়ে নেওয়া বা কোণঠাসা করার এক প্রচ্ছন্ন প্রবণতা দেখা যায়। পরমব্রতর মতো একজন প্রতিষ্ঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তিত্বকেও যখন বলতে হয় যে তিনি দাঁতে দাঁত চেপে এবং সদ্যোজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে চরম অপমান সহ্য করে আপস করেছিলেন, তখন তা প্রমাণ করে এই মানসিক চাপ কতটা গভীর ও ভয়ানক হতে পারে। এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয় যে, গ্ল্যামার দুনিয়ার চকচকে পর্দার আড়ালে শিল্পীদের প্রায়শই এক অমোঘ অস্তিত্বের লড়াই লড়তে হয়, যেখানে স্বাধীনতার চেয়ে টিকে থাকাটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।

অভিনেতার বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি হলো রোজগার এবং কম্প্রমাইজ প্রসঙ্গটি। একজন সাধারণ মানুষের মতো সেলিব্রিটিদেরও যে দিনশেষে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং পরিবারের মুখের দিকে তাকাতে হয়, পরমব্রত সেই বাস্তবতাকে কোনো রাখঢাক না করেই স্বীকার করেছেন। আদর্শগত দিক থেকে যতই শক্তিশালী হওয়া যাক না কেন, যখন কর্মক্ষেত্র বা রুটি-রুজির ওপর আঘাত আসে, তখন যেকোনো মানুষই আপস করতে বাধ্য হন। পরমব্রতর এই বক্তব্য বিনোদন জগতের পেশাদারিত্বের অভাবকে নগ্ন করে দেয়। এটি দেখায় যে, শিল্পচর্চার স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করার চেয়ে কীভাবে ক্ষমতার দাপটে শিল্পীদের কণ্ঠরোধ করার বা তাঁদের বাধ্য করার এক অদৃশ্য সংস্কৃতি কাজ করে চলেছে।

আরও পড়ুনঃ টিআরপি তালিকায় শীর্ষে দুই জনপ্রিয় মেগা! ছিটকে গেল পরিণীতা! দেখে নিন এই সপ্তাহের দুর্ধর্ষ টিআরপি তালিকা!

এই ভিডিওটির আরেকটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো পরমব্রতের পাশে রুদ্রনীল ঘোষের উপস্থিতি। বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক মতাদর্শের হওয়া সত্ত্বেও এই দুই সমসাময়িক অভিনেতার একসঙ্গে বসা এবং ইন্ডাস্ট্রির সার্বিক সমস্যা নিয়ে মুখ খোলা এক নতুন বার্তা দেয়। পরমব্রত স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তিনি কোনো ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা বিষোদ্গার করতে আসেননি, বরং বিনোদন জগতকে একটি সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। এই আলোচনার মূল নির্যাস হলো ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো নবীন বা প্রবীণ শিল্পীকে শুধুমাত্র মতাদর্শগত অমিল বা ক্ষমতার দাপটের কারণে কাজ হারাতে না হয় এবং দাঁতে দাঁত চেপে অপমান সহ্য করতে না হয়। টলিউডের সার্বিক উন্নতির স্বার্থে এই ধরণের ব্যান কালচারে নোংরা খেলা বন্ধ হওয়া যে অত্যন্ত জরুরি, পরমব্রতর এই মনখোলা ও সাহসী বার্তাটি তারই জোরালো দলিল।

Back to top button