‘স্যালারি দেওয়ার টাকা ছিল না, ছেলের মুখে…’ ‘বাড়ি বিক্রি করে হলেও টাকা দিতে হতো…’ ‘আমি অপমানটা ভুলিনি!’ ক্ষমতাচ্যুত স্বরূপ বিশ্বাসকে নিয়ে বিস্ফোরক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়!

টলিউড (Tollywood) স্টুডিওপাড়ার অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে চলা ক্ষমতার দাপট, সিন্ডিকেট রাজ এবং টালমাটাল রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে এবার নজিরবিহীনভাবে মুখ খুললেন অভিনেতা ও পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় (Parambrata Chatterjee)। সম্প্রতি সাক্ষাৎকারে টলিপাড়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং ফেডারেশনের একাধিপত্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি। গত কয়েক বছরে বাংলা বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের পরিবেশ কতটা দমবন্ধকর এবং রাজনৈতিক স্বার্থে কলুষিত হয়ে উঠেছিল, পরমব্রতর এই স্পষ্টবক্তা সাক্ষাৎকার যেন তারই এক জীবন্ত দলিল। ক্ষমতার অলিন্দে থাকা রথী-মহারথীদের সরাসরি নিশানা করে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইন্ডাস্ট্রির এই নোংরা রাজনীতি শুধু সংস্কৃতির ক্ষতি করেনি, বরং বহু টেকনিশিয়ান ও শিল্পীর রুজি-রুটিতেও আঘাত হেনেছে।
ফেডারেশন অফ সিনেমা টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া (FCTWEI)-এর দীর্ঘদিনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের একনায়কতন্ত্র ও নিয়ন্ত্রণ নীতির বিরুদ্ধে এই সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছেন পরমব্রত। তিনি অভিযোগ করেন, ফেডারেশনের শীর্ষনেতৃত্ব কোনো গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দলদাসের মতো স্টুডিওপাড়া শাসন করছিল। এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কারণে টলিউডে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছিল যে, গত আড়াই দশক ধরে পরমব্রত যে সমস্ত সিনেমা কর্মী ও টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে ভাই-বন্ধুর মতো কাজ করেছেন, তাঁদেরকেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বা সুস্থভাবে কথা বলতে বাধা দেওয়া হতো। সাধারণ টেকনিশিয়ানদের এইভাবে ভয় দেখিয়ে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা ও ক্ষমতার দাপট তাঁকে মানসিকভাবে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই লড়াইয়ের দিনগুলোতে তাঁর ওপর দিয়ে যাওয়া তীব্র আর্থিক ও মানসিক লাঞ্ছনার এক অন্ধকার অধ্যায় তুলে ধরেছেন পরমব্রত। তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে স্বীকার করেন, এই পরিকল্পিত কোণঠাসা করার রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের দুটি নির্দিষ্ট দিনে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে কেঁদে ফেলেছিলেন। টলিপাড়ার একাধিপত্যবাদীরা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল যেখানে তাঁর কাজের সমস্ত পথ এক এক করে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল, এমনকি সহকর্মীদের স্যালারি দেওয়ার মতো টাকাও তাঁর কাছে অবশিষ্ট ছিল না। চারপাশ থেকে যখন চূড়ান্ত দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছিল, তখন কোনো রাজনৈতিক শক্তির কাছে মাথা নত না করে কেবল নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে সমস্ত মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতন সহ্য করে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন এই পরিচালক।
অতীতে শাসকদলের বিভিন্ন মঞ্চে এবং বিশেষ করে রাজ্য সরকারের ‘পুজো কার্নিভাল’-এ তাঁর উপস্থিতি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তারও অত্যন্ত সোজাসাপ্টা ব্যাখ্যা দিয়েছেন পরমব্রত। তিনি জানান, কার্নিভালের দিন তিনি সাধারণ দর্শকাসনেই বসতে গিয়েছিলেন, কিন্তু খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ডেকে তাঁর পাশে বসানোয় সৌজন্যের খাতিরে তিনি তা এড়াতে পারেননি। একই সাথে অরূপ বিশ্বাস এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি বলেন, টলিউডের এই প্রশাসনিক অরাজকতা ও ফেডারেশনের দাপটের পেছনে ক্ষমতার শীর্ষ স্তর থেকে একটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল বলেই ইন্ডাস্ট্রির সবার মনে হতো। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলানোর সাথে সাথে টলিপাড়ার একাংশের রাতারাতি রঙ বদলে বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ার যে ‘সুবিধাবাদী’ প্রবণতা, তারও কড়া সমালোচনা করতে ছাড়েননি তিনি।
আরও পড়ুনঃ অ্যাকশন অবতারে মিমি! ‘কুইনস’-এর ট্রেলার দেখে স্বামীর প্রাক্তনীর প্রশংসায় ভাসালেন শুভশ্রী! জানেন কি বললেন অভিনেত্রী?
সাক্ষাৎকারের একদম শেষভাগে ক্ষমতাচ্যুত স্বরূপ বিশ্বাসের উদ্দেশ্যে পরমব্রতর ছোঁড়া একটি বাক্যই এখন গোটা টলিপাড়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে; তিনি সরাসরি বলেন, “আমি অপমানটা ভুলিনি।” নিজের সতীর্থদের থেকে দূরে সরে যাওয়ার যন্ত্রণা, টেকনিশিয়ানদের বঞ্চনা এবং ইন্ডাস্ট্রির সুস্থ পরিবেশকে গলা টিপে হত্যা করার এই ইতিহাস তিনি কোনোদিন ভুলবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। পরমব্রতর এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার কেবল একজন শিল্পীর জমে থাকা ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি ক্ষমতার পালাবদলের পর টলিউডকে রাজনৈতিক রাহুমুক্ত করার এবং সাধারণ টেকনিশিয়ান ও প্রযোজকদের স্বার্থে এক নতুন, মুক্ত ও গণতান্ত্রিক স্টুডিওপাড়া গড়ে তোলার এক জোরালো আর্তি।

