‘গলাটা শুনি কারণ ওটা অবিকল আমার ছেলের গলার মতো, যাকে আমি বহুদিন আগেই হারিয়ে ফেলেছি…’ ‘এভাবেই আমি শুরু করেছিলাম…’ জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোসের বিষয়টি ভাগ করে নিলেন মীর আফসার আলী!

টেলিভিশন সঞ্চালক, রেডিও জকি, অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পী বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মীর আফসার আলী (Mir Afsar Ali) বাঙালি দর্শকের অত্যন্ত প্রিয় এক নাম। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে টাইমস এফএম-এর মাধ্যমে রেডিও জকি হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে রেডিও মির্চির ‘হাই কলকাতা’ এবং ‘সানডে সাসপেন্স’-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় শো-এর মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠস্বর প্রতিটি বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। শুধু রেডিও নয়, ছোটপর্দায় ‘খাসখবর’ নামের সংবাদ অনুষ্ঠান দিয়ে তাঁর টেলিভিশন যাত্রা শুরু এবং পরবর্তীতে জনপ্রিয় কমেডি রিয়ালিটি শো ‘মীরাক্কেল’-এর সঞ্চালক হিসেবে তিনি সাফল্যের শিখরে পৌঁছান। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছোট ভিডিওবার্তায় মীর তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারের শুরুর দিকের এমনই এক অদ্ভুত ও আবেগঘন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প ভাগ করে নিয়েছেন, যা শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে গেছে।
ভিডিওটিতে মীর জানান, ১৯৯৫ সালে যখন তিনি নতুন নতুন রেডিও জকি হিসেবে কাজ করছেন, তখন তাঁর জীবনের এক পরম প্রাপ্তি ঘটেছিল। সেই সময় এক অপরিচিত ভদ্রমহিলা মীরকে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে কোনো নাম লেখা ছিল না। চিঠিতে সেই মহিলা লিখেছিলেন যে তিনি নিয়মিত মীরের রেডিও অনুষ্ঠান শোনেন, কারণ মীরের গলার আওয়াজ হুবহু তাঁর প্রয়াত ছেলের মতো। খুব কম বয়সে সন্তানকে হারিয়ে ফেলা সেই মা রেডিওর স্পিকারে মীরের কণ্ঠের মাঝেই নিজের সন্তানকে ফিরে পেতেন। এই চিঠিটি মীরের মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে তিনি সম্পূর্ণ অজানা এই শ্রোতাকে নিজের এক ‘অপরিচিত মা’ হিসেবে মনে মনে স্থান দিয়েছিলেন।

রেডিওর সেই অদৃশ্য মাধ্যমটি কীভাবে দুটি অচেনা মানুষের মনকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল, মীর তাঁর স্মৃতিচারণায় তা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মীর জানান, তিনি মাইক্রোফোনের ওপার থেকে বুঝতে পেরেছিলেন যে ওপারে যিনি আছেন, তিনি আর কেউ নন একজন শোকার্ত মা। ফলে মীরও মনে মনে তাঁকে নিজের মায়ের মতোই ভালোবাসতে শুরু করেন। কোনোদিন দেখা না হওয়া সত্ত্বেও কেবল মাত্র একটি কণ্ঠস্বরের ওপর ভর করে এক অদ্ভুত এবং গভীর আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছিল একজন মা ও সন্তানের মতো। দীর্ঘ তিন বছর ধরে এই অদৃশ্য টান বজায় ছিল অত্যন্ত সুন্দরভাবে।
তবে জীবনের এই সুন্দর গল্পটিতে একটি বড় মোড় আসে ১৯৯৮ সালে, যা মীরের মনে আজও এক বড় আফসোস হয়ে রয়ে গেছে। ওই বছর মীর প্রথমবার টেলিভিশনের পর্দায় সংবাদ সঞ্চালক হিসেবে ‘খাসখবর’ অনুষ্ঠানে আত্মপ্রকাশ করেন। রেডিওর গণ্ডি পেরিয়ে মীর যখন দৃশ্যমান মাধ্যমে পা রাখলেন, তখন সেই অপরিচিত মায়ের কাছ থেকে তিনি আরও একটি চিঠি পান। কিন্তু এবারের চিঠির ভাষা আনন্দ বা শুভেচ্ছার ছিল না, বরং তা ছিল এক বুক অভিমানে ভরা।
আরও পড়ুনঃ একদিকে ঝিনুকের বিয়ের নিমন্ত্রণ জানালো কমলা! অন্যদিকে পল্লবীর চরম হুঁশিয়ারি! সবটা দেখে আদিত্যকে নিয়ে কমলার মনে সন্দেহ? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব!
সেই শেষ চিঠিতে ভদ্রমহিলা মীরকে জানান যে এটিই তাঁর শেষ চিঠি, কারণ টেলিভিশনে মীরের আসল চেহারা দেখার পর তিনি তাঁর প্রয়াত ছেলের মুখের সাথে মীরের মুখ কোনোভাবেই মেলাতে পারছেন না। চোখের সামনে ধরা দেওয়া বাস্তবতার কারণে তাঁর মনের ভেতরের সেই সুন্দর রূপকথাটি ভেঙে যায়। মীর অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানান, পর্দায় আসার কারণে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় এবং খাঁটি একজন শ্রোতাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। কেবল মাত্র একটি গলার আওয়াজ যে কত বড় আবেগের দেওয়াল তৈরি করতে পারে এবং চোখের দেখা কীভাবে সেই মায়াজাল এক নিমেষে ভেঙে দিতে পারে, মীরের এই গল্পটি তারই এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রইল।

