‘সবাই জানত আমি তাপস পালের ছেলে’, ‘চরম অপমানে ইন্ডাস্ট্রি ছেড়েছি!’ টলিউডের বড় পরিচালকদের নিয়ে বিস্ফোরক মাস্টার রিন্টু!

আশির দশকের শেষভাগ আর নব্বইয়ের দশকের শুরুর কথা। টলিউডের রুপালি পর্দায় যখন বড় বড় নায়কদের ভিড়, তখন এক একরত্তি শিশু তার নিষ্পাপ চাহনি আর সাবলীল অভিনয় দিয়ে জয় করে নিয়েছিল আপামর বাঙালির মন। তিনি মৃন্ময় কাঞ্জিলাল (Mrinmoy Kanjilal), যাঁকে আট থেকে আশি সবাই চিনত ‘মাস্টার রিন্টু’ নামে। ‘গুরুদক্ষিণা’ থেকে ‘পথ প্রাসাদ’, ‘তুমি কত সুন্দর’ থেকে ‘দোলনচাঁপা’ একের পর এক সুপারহিট ছবিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল অবধারিত। একসময় পরিস্থিতি এমন ছিল যে, এই ছোট্ট শিল্পীর ডেট পাওয়ার জন্য বড় বড় প্রযোজক ও পরিচালকদের লাইন লেগে থাকত। সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রটি আজ গ্ল্যামারের চাকচিক্য থেকে দূরে কোন জীবন অতিবাহিত করছেন, তা জানলে যেকোনো চলচ্চিত্র প্রেমীর চোখে জল আসবে।
রিন্টুর অভিনয় জীবনের শুরুটা হয়েছিল মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর বয়সে। ‘তুমি কত সুন্দর’ ছবিতে তাপস পাল ও মুনমুন সেনের ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি সকলের নজর কাড়েন। তৎকালীন সময়ে তাপস পালের সাথে তাঁর চেহারার এতটাই মিল ছিল যে, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই মনে করতেন রিন্টু বোধহয় তাপস পালেরই নিজের ছেলে। তাঁর শৈশব কেটেছে কিংবদন্তিদের কোলে চড়ে। তরুণ মজুমদার, সন্ধ্যা রায় কিংবা অঞ্জন চৌধুরীর মতো মানুষেরা তাঁকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। সন্ধ্যা রায় তো শুটিংয়ের সময় তাঁকে নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া থেকে স্নান করানো সবটাই সামলাতেন। সেই দিনগুলো আজও রিন্টুর স্মৃতিতে অমলিন, যা ভাবলে তিনি আজও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
তবে রুপালি পর্দার জাদুকরী আলো সবসময় এক থাকে না। কৈশোরের দোরগোড়ায় পৌঁছাতেই রিন্টুর জীবনের ছন্দপতন ঘটে। শৈশবের সেই জনপ্রিয়তা বড় বয়সে আর কাজে আসেনি। একসময় যাঁর জন্য সিনেমার টিকিট বিক্রি হতো, সেই রিন্টুকেই পরবর্তী সময়ে কাজের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। পারিবারিক বিপর্যয়, বাবার অসুস্থতা এবং আর্থিক সংকট তাঁকে বাধ্য করে অভিনয়ের রঙিন দুনিয়া ছেড়ে বাস্তবের কঠিন মাটিতে পা রাখতে। অভাবের দিনগুলোতে পড়াশোনার খরচ চালাতে তাঁকে ছোট ছোট বাচ্চাদের টিউশন পর্যন্ত পড়াতে হয়েছে। গ্ল্যামার দুনিয়ার সেই ‘মাস্টার রিন্টু’ ১০৭ কেজি ওজনের এক হতাশাগ্রস্ত যুবকে পরিণত হয়েছিলেন, যদিও পরে অদম্য মানসিক শক্তিতে নিজেকে আবার ফিট করে তোলেন।
ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর শেষ দিকের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল ২০০৭ সালে মিঠুন চক্রবর্তীর সাথে ‘টাইগার’ ছবিতে। সেখানে তাঁর অভিনয় দেখে স্বয়ং মিঠুন দা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন। বড় বয়সে ‘প্রতিজ্ঞা’ বা ‘হিরোগিরি’-র মতো ছবিতে তাঁকে ছোট কিছু চরিত্রে দেখা গেলেও, ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান ধারার সাথে তিনি নিজেকে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি। আক্ষেপের সুরে তিনি জানান, আজকের অনেক নামী পরিচালক তাঁকে চেনেনই না, কিংবা চিনলেও যোগ্য মর্যাদা দেননি। এমনকি কাজের খোঁজে গিয়ে তাঁকে অসম্মানিত হয়েও ফিরে আসতে হয়েছে। পর্দার সেই আদরের ছোট্ট খোকা আজ এক সাধারণ চাকরিজীবী, যিনি সংসারের জোয়াল টানতে নিজের অভিনয়ের স্বপ্নকে একপাশে সরিয়ে রেখেছেন।
আরও পড়ুনঃ ১৮ ইঞ্চি সেলাইয়ের দগদগে ঘা! মা’রণ রোগের য’ন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই! মৃ’ত্যুকে সামনে দেখেও জীবনের প্রতি ভালোবাসা হারাননি বর্ষীয়ান অভিনেত্রী!
রিন্টুকে শেষবার পর্দায় বড় কোনো চরিত্রে দেখা গিয়েছে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ছবি বা দেবের ‘ওয়ান্টেড’-এ ছোট একটি ভূমিকায়। বর্তমানে তিনি তাঁর স্ত্রী, ছোট্ট সন্তান এবং মাকে নিয়ে এক মধ্যবিত্ত জীবন কাটাচ্ছেন। অভিনয়ের নেশা আজও তাঁর রক্তে মিশে আছে, তাই বিনাপারিশ্রমিকে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অভিনয় শেখান তিনি। বড় পর্দার সেই জৌলুস হয়তো আজ নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি আজও বাংলার দর্শকদের মনে অমলিন। নিউজ আর্টিকেলের শেষে এই প্রশ্নটাই থেকে যায় যে শিল্পীরা আমাদের শৈশবকে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন, কেন তাঁদের পরিণতী এমন অবহেলা আর একাকীত্বের হয়? মাস্টার রিন্টুর গল্প কেবল একজন অভিনেতার নয়, এটি সময়ের নিষ্ঠুর পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।

