‘৪৮ ঘণ্টায় এত তাড়াতাড়ি রং বদলানোর মানে হয় না’, ‘নিজেদের শিরদাঁড়া ভেঙে ফেললে মানুষ চিনবে কী করে?’ পরমব্রতের টুইট বিতর্ক টেনে টলিউডকে তুলোধোনা লকেট চট্টোপাধ্যায়ের!

পশ্চিমবঙ্গের বিনোদন জগৎ তথা টলিউডের (Tollywood) অন্দরে রাজনীতি ও ক্ষমতার লড়াই নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি অভিনেতা-পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের (Parambrata Chatterjee) রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন, ফেডারেশনের চাপ এবং তাঁর সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সেই বিতর্ক আবারও নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এই আবহে টিভি৯ বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরমব্রতের নাম উল্লেখ করে এবং তাঁর সুর বদলানো নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন টলিউডের প্রাক্তন অভিনেত্রী ও বর্তমান বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের এই দ্বৈরথ এবং টলিউডের বর্তমান ‘ব্যান কালচার’ বা কাজ বন্ধের রাজনীতি এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম প্রধান চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লকেট চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষোভের মূল জায়গাটি হলো শিল্পীদের দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন বা সুযোগ বুঝে সুর বদলে ফেলা। সাক্ষাৎকারে তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০১৫ সালে তিনি যখন টলিউডের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তখন টলিউডের একাংশ বিজেপিকে কার্যত অচ্ছুত বলে মনে করত। লকেটের কথায়, “আমি তো ২০১৫-তে বিজেপিতে এসেছি, তখন বিজেপিতে আসা মানেই একটা অচ্ছুত, একটা মাথা খারাপ এরকম।” তিনি অভিযোগ করেন, ২০২১ সালের নির্বাচনের সময় যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন, পরিস্থিতি দেখে আজ মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁরা সুর বদলে ফেলছেন। পরমব্রতের সাম্প্রতিক মন্তব্য যেখানে তিনি ফেডারেশনের চাপের মুখে পড়ে নিজের অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন সেটিকে তীব্র কটাক্ষ করে লকেট বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিজেপিকে এত ছোট করার পর তারা আজকে বলছে যে আমাদের সংসার আছে, আমাদের বাচ্চা আছে। এসব কথা আজকে এরকম একটা শিল্পীর কাছ কাছ থেকে এই ধরনের কথাবার্তা কেউ আশা করে?” লকেটের স্পষ্ট বার্তা, “আমরাই যদি আজকে নিজেদের শিরদাঁড়াটাকে ভেঙে ফেলি তাহলে মানুষ আমাদের কিভাবে চিনবে?”
এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা দুই ব্যক্তিত্বের কর্ম ও রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য নজরে আসে। ১৯৭৪ সালে জন্ম নেওয়া লকেট চট্টোপাধ্যায় একজন দক্ষ ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী হিসেবে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। মমতা শঙ্করের ব্যালে ট্রুপের সদস্য হিসেবে কাজ করার পর তিনি টলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখেন। ‘চোখের বালি’, ‘মায়ের আঁচল’, ‘ক্রান্তি’ বা ‘মিনিস্টার ফাটাকেষ্ট’-র মতো একাধিক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করে তিনি দর্শক মহলে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। ২০১৪ সালে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরে তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটলেও, ২০১৫ সালেই তিনি দল পরিবর্তন করে বিজেপিতে যোগ দেন। এরপর দলের রাজ্য মহিলা মোর্চার সভাপতি এবং পরবর্তীতে রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব সামলান। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে হুগলি কেন্দ্র থেকে সাংসদ (MP) নির্বাচিত হয়ে তিনি দিল্লির দরবারে বাংলার অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছিলেন।
অন্যদিকে, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় টলিউডের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং উচ্চশিক্ষিত পরিবার থেকে এসেছেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক দম্পতির সন্তান এবং কিংবদন্তি পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের আত্মীয় পরমব্রত ছোটবেলা থেকেই এক প্রগতিশীল পরিবেশে বড় হয়েছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা এবং পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনার ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া পরমব্রত টলিউডের অন্যতম সফল অভিনেতা ও পরিচালক। ‘ভাল থেকো’, ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘কাহানি’, ‘হেমলক সোসাইটি’-র মতো অসংখ্য জনপ্রিয় ছবিতে তাঁর অভিনয় এবং ‘সোনার পাহাড়’ বা ‘অভিযান’-এর মতো ছবির পরিচালনা তাঁকে ইন্ডাস্ট্রির একজন প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজনৈতিকভাবে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই বাম-উদারপন্থী ভাবধারার সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বিগত সময়ে বিজেপির কট্টর সমালোচনা করে এসেছেন। তবে টলিউডের অন্দরে কাজের পরিবেশ ও নিজের প্রযোজনা সংস্থাকে বাঁচানোর তাগিদে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ আদিত্যর দৌলতে সাগরের বাড়িতে ঢুকে পড়ল পল্লবী! মিঠিকে কি ওই নির্মম অ’ত্যাচার থেকে বাঁচাতে পারবে সে? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
সাম্প্রতিক এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষের উদ্যোগে আয়োজিত টলিউডের একটি বিশেষ বৈঠককে কেন্দ্র করে, যেখানে পরমব্রত উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ইন্ডাস্ট্রির ‘ব্যান কালচার’ বা কাজের ক্ষেত্রে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নানা আলোচনা হয়। এরপরই পরমব্রতের পুরনো কিছু সামাজিক মাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতা তৈরি হয় এবং লকেট চট্টোপাধ্যায় সরাসরি পরমব্রতের এই দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের সমালোচনা করেন। লকেটের মতে, টলিউডের শিল্পীদের উচিত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য তাড়াহুড়ো করে নীতি বিসর্জন না দিয়ে ধৈর্য ধরা। তিনি পরমব্রতদের উদ্দেশ্যে বলেন, “নিজেদের সম্মানটা বজায় রাখুক এবং বজায় রেখে থাকুক, এইসব ধরনের কথাবার্তা বলে কিন্তু প্রত্যেকটা শিল্পী তাদের সমাজ মাধ্যমে নিজেদের সম্মানটাকে নষ্ট করে ফেলছেন।” লকেট স্পষ্ট করে দেন যে, সাধারণ মানুষ কিন্তু শিল্পীদের এই দ্রুত বদলে যাওয়াটা ভালো চোখে দেখছেন না।

