‘মিঠুনদার ডাকেই আসা, টলিউড তো…’ ‘অন্যায় মেনেছি কিন্তু প্রতিবাদ থামাইনি!’ টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুললেন লকেট চট্টোপাধ্যায়!

বাংলা চলচ্চিত্র (Tollywood) ও দূরদর্শনের অত্যন্ত পরিচিত মুখ এবং বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ লকেট চট্টোপাধ্যায় (Locket Chatterjee) টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে লকেট চট্টোপাধ্যায় টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। বহু বাণিজ্যিক ও সমান্তরাল ধারার সফল ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার পাশাপাশি ছোটপর্দাতেও তিনি ছিলেন সমান জনপ্রিয়। পরবর্তীতে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেন এবং নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শকে সামনে রেখে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হন। দীর্ঘ সময়ের এই অভিনয় জীবন এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মেলবন্ধনেই আজ তিনি বিনোদন জগৎ ও রাজনীতির অন্দরের সমীকরণগুলোকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি টলিউডের বর্তমান সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং শিল্পীদের কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিয়ে নিজের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেছেন।

রাজনীতি এবং টলিউডের বর্তমান কর্মপরিবেশের মেলবন্ধন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, শিল্প বা শিল্পীদের গায়ে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রং লাগানো একেবারেই অনুচিত। লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মতে, একজন শিল্পী কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করছেন বা কার আদর্শে বিশ্বাসী, তার ওপর ভিত্তি করে কখনো তাঁর পেশাদার জীবনকে বিচার করা উচিত নয়। টলিউডে ইদানীংকালে যে অলিখিত ‘ব্যান’ বা বয়কটের সংস্কৃতি দেখা যায়, তার তীব্র বিরোধিতা করেছেন তিনি। কোনো সিনেমার গল্প যদি ভালো হয় এবং তা যদি দর্শকদের জন্য তৈরি হয়, তবে কোনো রাজনৈতিক কারণে যেন সেই সিনেমা বা তার সাথে যুক্ত কলাকুশলীদের আটকে দেওয়া না হয়। শিল্পীরা যাতে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের সৃষ্টিশীল কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই যাতে কাজ পান, সেই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

ইন্ডাস্ট্রিতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কাজ হারানোর বিষয়টি যে কেবল কাল্পনিক নয়, তা বোঝাতে গিয়ে লকেট চট্টোপাধ্যায় নিজের ব্যক্তিগত জীবনের এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিগত ২০১৪ সালে তিনি যখন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলে যোগদান করেছিলেন, তখন টলিউডে তাঁকে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বহু নামী প্রযোজকের সাথে তাঁর কাজের কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার এবং চুক্তিপত্রে সই হয়ে যাওয়ার পরেও, রহস্যজনকভাবে তাঁকে সেই সমস্ত প্রজেক্ট থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময় প্রযোজকদের তরফ থেকে তাঁকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল যে, ‘উপরমহলের’ নির্দেশ ও আপত্তির কারণেই তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে তাঁরা বাধ্য হচ্ছেন। লকেট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সেই সময়ে টলিউডের কোনো সহকর্মী বা শিল্পীকে তিনি পাশে পাননি। তবে বর্তমান সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলাচ্ছে এবং শিল্পীরা এখন ব্যালট বা ভোটের বাক্সে নিজেদের প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ করতে শিখছেন।

টলিউডের ভেতরের নানাবিধ দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা ও টেকনিশিয়ানদের অভাব-অভিযোগ মেটানোর লক্ষ্যে সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে যে চার সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই উদ্যোগকেও তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে লকেট চট্টোপাধ্যায় যোগ করেন যে, ইন্ডাস্ট্রির ভালোমন্দের জন্য যে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপকে তাঁরা স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। তিনি মনে করেন, বিনোদন জগতের সাথে যুক্ত সমস্ত স্তরের মানুষ আসলে একটি বড় পরিবারের মতো। তাই টলিউডের যে কোনো সংকটে বা সহকর্মীদের যে কোনো প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে তিনি এবং তাঁর পরিচিত মহল সবসময় তৎপর থাকবেন। ইন্ডাস্ট্রি যাতে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না থেকে সাধারণ কলাকুশলী ও টেকনিশিয়ানদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, সেই দিকেই সকলের নজর দেওয়া উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুনঃ ‘নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে অনেক শুভেচ্ছা’ ‘এখন ভয়মুক্ত কাজের পরিবেশ চাই, কারণ এতদিন…!’ টলিউড শিল্পীদের সুরক্ষা নিয়ে মুখ খুললেন গায়িকা ইমন চক্রবর্তী!

সাক্ষাৎকারের শেষাংশে তিনি মেগাস্টার মিঠুন চক্রবর্তীর সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের সুমধুর পারিবারিক ও পেশাদার সম্পর্কের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। লকেট চট্টোপাধ্যায় জানান যে, তিনি তাঁর অভিনয় জীবনে মিঠুন চক্রবর্তীর সাথে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তখন থেকেই তাঁদের মধ্যে এক আত্মিক টান তৈরি হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রচারের ময়দানেও বিভিন্ন সময় তাঁদের দেখা হয়েছে এবং সেই সুবাদে তাঁদের সম্পর্ক একটি পরিবারের মতোই হয়ে উঠেছে। মহাগুরুর ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েই তিনি এদিন পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। কাজের ব্যস্ততার মাঝেও পুরনো বন্ধুদের সাথে কাটানো এই মুহূর্তগুলো যে অত্যন্ত আনন্দের, তা উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এবং টলিউডের প্রত্যেকটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাঁদের ভালো রাখাই শেষ পর্যন্ত তাঁদের মূল লক্ষ্য ও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

Back to top button