‘আমরা মূর্খ, আমাদের মূর্খামির গালে সজোরে থাপ্পড় মেরে গেল রাহুল!’ শুটিং সেটে নিরাপত্তা নিয়ে বি’স্ফোরক কৌশিক সেন!

টলিউড (Tollywood) অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্টুডিও পাড়ায়। কিন্তু এই শোকের পাশাপাশি এখন যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, তা হলো টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে শিল্পীদের নিরাপত্তা। আউটডোর শুটিং হোক বা ইনডোর ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে অভিনয়ের সময় নিরাপত্তার চরম অভাব রয়েছে বলে দাবি তুলেছেন প্রথম সারির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে অভিনেতা কৌশিক সেন থেকে শুরু করে সৌমিতৃষা কুণ্ডু এবং অম্বরীশ ভট্টাচার্যরা সরাসরি ইন্ডাস্ট্রির পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। শুটিং সেটে সঠিক সুরক্ষাবিধি মেনে চলার জন্য এবার আর্টিস্ট ফোরাম এবং টেকনিশিয়ান ফেডারেশন সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হয়েছে।
শুটিং সেটে নিরাপত্তা নিয়ে অভিনেতা কৌশিক সেন অত্যন্ত কড়া ভাষায় নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র দুর্ঘটনার জন্য কাউকে দোষারোপ করার চেয়ে বেশি জরুরি হলো ব্যবস্থার পরিবর্তন। কৌশিক সেন ভিডিওতে বলেন, “আমি কাউকে দোষ দেবো না, এমনকি আমি নিজেকেও দোষ দেবো না যে আমি কেন এই ঝুঁকিগুলো নিয়েছি। আমাদের এই বোকামি বা মুখখামির ওপর সজোরে একটা থাপ্পড় মেরে দিয়ে গেল রাহুলের মৃত্যু। আমরা রাহুলের মৃত্যুর কারণ যেমন জানতে চাইব, তেমনই আমাদের সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন তুলব।” তাঁর মতে, জীবন বাজি রেখে কাজ করার এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন এবং শিল্পীদের জীবনের দাম সবার আগে দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে জনপ্রিয় অভিনেত্রী সৌমিতৃষা কুণ্ডু কাজ হারানোর ভয় এবং মানসিক চাপের বিষয়টি সামনে এনেছেন। অনেক সময় শিল্পীরা অসুবিধার কথা বললে সেটিকে ‘ট্যান্ট্রাম’ বা নখরামি হিসেবে তকমা দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। ভিডিওতে সৌমিতৃষার কণ্ঠে ফুটে ওঠে আক্ষেপ, তিনি বলেন, “আমাদের যে ইনসিকিউরিটি থাকে কাজ হারিয়ে যাওয়ার ভয় বা রিপ্লেস হয়ে যাওয়ার ইনসিকিউরিটি, সেগুলো নিয়ে যখন কেউ বেশি কথা বলে তখন সেটাকে অনেক সময় ট্যান্ট্রাম হিসেবে ধরা হয়। চাপের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় অনেক কিছু আমরা মানিয়ে নিই। কিন্তু দিনের শেষে আমাদের নিরাপত্তাটাই সবচেয়ে আগে হওয়া উচিত।” তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, স্টুডিও পাড়ায় শিল্পীদের দাবিদাওয়াকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
জনপ্রিয় অভিনেতা আম্বরীশ ভট্টাচার্যও এই নিরাপত্তা সংক্রান্ত দাবিতে নিজের সুর চড়িয়েছেন। তিনি মনে করেন, শিল্পীদের নিরাপত্তা বা সুরক্ষার বিষয়টি সব সময় গুরুত্ব পায় না, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আম্বরীশ ভট্টাচার্য তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বরাবর আমাদের এই দাবিটা ছিল যে আমরা সুরক্ষা চাই, নিরাপত্তা চাই। এমন নয় যে সব সময় নিরাপত্তা নেওয়া হয় না, কিন্তু অনেক সময় আমরা আমাদের দিক থেকে ভালো সৎ চিন্তাটা করি না যে নিরাপত্তা কতটা জরুরি। এখন আমার মনে হচ্ছে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা সব কিছুর আগে হওয়া দরকার। আমাদের শিল্পসত্তা ছাড়াও পারিবারিক পরিচয় আছে, আমরা কারোর সন্তান বা বাবা।” তিনি মনে করিয়ে দেন যে, শুটিং শেষে সুস্থভাবে বাড়িতে ফেরাটাই বড় সাফল্য হওয়া উচিত।
আরও পড়ুনঃ শুটিং সেটে আছড়ে পড়েছিল বিশালাকার পাথর! মৃ’ত্যুর মুখ থেকে ফিরেছিলেন দীপঙ্কর দে! শুটিং সেটের সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় অভিনেতাকে!
পরিশেষে, এই আন্দোলন যে কেবল অভিনেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ভিডিওর বয়ান থেকে পরিষ্কার। অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে এখন এক ছাতার তলায় আসতে হবে। তিনি অতীতের কেয়া চক্রবর্তীর উদাহরণ টেনে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, “বহু বছর আগে কেয়া চক্রবর্তীর একটা ঘটনা ঘটেছিল গঙ্গায় শুটিং করতে গিয়ে, তিনি ডুবে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও তো এই ধরনের ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে আজ থেকে সমস্ত হিসেব বদলে গেল। আর্টিস্ট ফোরাম, ফেডারেশন এবং গিল্ড—সবাই মিলে এবার নতুন নিয়মাবলি তৈরি করছে। এতগুলো মাথা যখন এক হয়েছে, তখন এবার সঠিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেই আমার বিশ্বাস।” এখন দেখার বিষয়, এই প্রতিবাদের পর টলিউডের শুটিং সেটে বাস্তবসম্মত কোনো পরিবর্তন আসে কি না।

