‘কারণ কান দিয়েই আমরা বুঝতে পারি…’ গুরুর নাম নিলে কেন কানে হাত দেন ছাত্ররা জানেন? এর আসল রহস্য জানালেন হৈমন্তী শুক্লা!

বাংলা গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধি এবং সুরের জাদুকর হলেন হৈমন্তী শুক্লা (Haimanti Shukla)। উচ্চাঙ্গ সংগীত থেকে শুরু করে বাংলা আধুনিক গান প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর অসামান্য কণ্ঠের ছোঁয়া শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে দশকের পর দশক ধরে। কপালে বড় লাল টিপ, খোলা চুল আর সিল্কের শাড়ির নিজস্ব সিগনেচার স্টাইল-এর পাশাপাশি তাঁর অমায়িক ও মাটির কাছাকাছি ব্যক্তিত্ব তাঁকে আপামর বাঙালির কাছে অত্যন্ত প্রিয় করে তুলেছে। সম্প্রতি জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মেখলা দাশগুপ্তের পডকাস্ট শোতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে নিজের দীর্ঘ সংগীত জীবনের অভিজ্ঞতা এবং গানের ব্যাকরণ নিয়ে এক খোলামেলা আড্ডায় মাতলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।
এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে গানের রেওয়াজ ও বিভিন্ন কৌশল নিয়ে কথা বলার সময় হৈমন্তী শুক্লা বর্তমান প্রজন্মের বহুল প্রচলিত কিছু ধারণাকে বেশ সহজভাবে খণ্ডন করেছেন। সংগীত শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকেই অনেক সময় জটিল শারীরিক প্রক্রিয়া বা কৌশলের ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে থাকেন। যেমন, গান গাওয়ার জন্য নাভি থেকে আওয়াজ বের করা বা এই জাতীয় নানা কঠিন কসরতের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু এই অভিজ্ঞ প্রবীণ শিল্পী স্পষ্ট জানান যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই ধরনের তাত্ত্বিক বা জটিল বিষয়গুলোতে খুব একটা বিশ্বাস করেন না। তাঁর মতে, গানকে এত জটিল করে তোলার কোনো প্রয়োজন নেই।
সুর সাধনার আসল রহস্যটি উন্মোচন করতে গিয়ে শিল্পী এক অভিনব ও চিরন্তন সত্যের দিকে নির্দেশ করেছেন। তিনি জানান, গান গাওয়ার সময় সুরটি গলায় ঠিকমতো লাগছে কি না, তা মানুষের নিজের কান-ই সবচেয়ে ভালো বলে দেয়। সংগীতের জগতে একজন শিল্পীর নিজের কানই তার সবচেয়ে বড় বিচারক এবং পথপ্রদর্শক। গান গাওয়ার সময় যদি সুর সামান্যতম কেটে যায় বা গায়বানি বেসুরো হয়ে পড়ে, তবে একজন সজাগ শিল্পীর কান এবং সচল মস্তিষ্কই সবার আগে সেই ভুলটি ধরে ফেলে। তাই বাইরের কোনো কৌশলের চেয়ে নিজের শোনার ক্ষমতাকে উন্নত করা বেশি জরুরি।
আরও পড়ুন: ‘ওদের সবটা ভুল প্রমাণিত হল, এবার যান ওদের গিয়ে জিজ্ঞেস করুন!’ ‘প্রমাণ তো দিলাম, এর থেকে…’ ২০ সাংসদের স্বাক্ষর ঘিরে জোর চর্চা! নাম রয়েছে দেবের! লিখিত প্রমাণ সহ ম্যাজিক ফিগার নিয়ে প্রকাশ্যে শতাব্দী রায়!
কথায় কথায় উঠে আসে সনাতন সংগীত শিক্ষার গুরু-শিষ্য পরম্পরার একটি চেনা অভ্যাসের কথা। সাধারণত শিষ্যরা গুরুর নাম নেওয়ার সময় বা তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা জানাতে কানে হাত দিয়ে থাকেন। এই বিষয়টি উল্লেখ করে হৈমন্তী শুক্লা একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, কেলমাত্র লোকদেখানো বা বাহ্যিক প্রথা হিসেবে কানে হাত দিয়ে ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখালেই সুর কিন্তু ঠিক হয়ে যায় না। আসল গুরু লুকিয়ে আছে নিজের ভেতরেই। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেন, কান-ই হচ্ছে আসল গুরু। কানকে সজাগ ও তৈরি রাখাটাই একজন প্রকৃত সংগীতশিল্পীর আসল সাধনা।
ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। হৈমন্তী শুক্লার মতো একজন কিংবদন্তির মুখ থেকে সুর ও সাধনার এই সহজ-সরল পাঠ বর্তমান প্রজন্মের নতুন ও উদীয়মান সংগীতশিল্পীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান এক উপদেশ। জটিল তাত্ত্বিক বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে কেবল মন ও কান সজাগ রেখে সুরকে আপন করে নেওয়ার এই বার্তা সংগীতের আঙিনায় এক নতুন ভাবনার খোরাক জোগাল, তা বলাই বাহুল্য।

