সাফল্যের চূড়ায় থেকেও কেন নির্বাসনে ‘বড় বউ’ রত্না সরকার,‘মেজ বউ’ চুমকি চৌধুরী ও ‘ছোট বউ’ দেবিকা মুখোপাধ্যায়? জানেন কোন রহস্য লুকিয়ে তিন অভিনেত্রীর অন্তর্ধানের অন্তরালে?

নব্বইয়ের দশকে অঞ্জন চৌধুরী (Anjan Chowdhury) পরিচালিত ‘বড় বউ’, ‘মেজ বউ’ এবং ‘ছোট বউ’ এই তিনটি সিনেমা বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এক অভূতপূর্ব জোয়ার এনেছিল। মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন, মূল্যবোধ এবং অন্দরমহলের গল্পকে তিনি এতটাই নিপুণভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবনের প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছিল এই ছবিগুলোতে। তৎকালীন সময়ে সিনেমা হলগুলো মাস খানেক ধরে হাউসফুল থাকত এবং এই ছবিগুলো বাণিজ্যিক সাফল্যের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল।

কয়েক দশক পার হয়ে গেলেও এই সিনেমাগুলোর জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। বর্তমানে স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং ইউটিউবের যুগেও ড্রয়িং রুমে বসে পরিবারের সবাই মিলে এই ছবিগুলো দেখার চল কমেনি। অঞ্জন চৌধুরীর সহজ-সরল সংলাপ এবং পারিবারিক সংঘাতের শৈল্পিক উপস্থাপনা আজও দর্শকদের সমানভাবে আবেগপ্রবণ করে তোলে, যা এই চলচ্চিত্রগুলোকে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এভারগ্রিন ক্লাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বড় বউ’ সিনেমায় নামভূমিকায় বা বড় বউয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী রত্না সরকার। এর আগে ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মেজ বউ’ ছবিতে অঞ্জন চৌধুরীর নিজের কন্যা চুমকি চৌধুরী মেজ বউয়ের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। আর এই ধারার শুরুতেই অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের ‘ছোট বউ’ সিনেমায় ছোট বউয়ের সেই কালজয়ী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী দেবিকা মুখোপাধ্যায়।

নব্বইয়ের দশকের সেই তুমুল জনপ্রিয়তার জোয়ার সত্ত্বেও এই তিন অভিনেত্রীর ক্যারিয়ার পরবর্তী সময়ে আর সেভাবে ডালপালা মেলেনি, যা বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক অদ্ভুত বাস্তবতা। রত্না সরকার, যিনি ‘বড় বউ’ হিসেবে আকাশছোঁয়া পরিচিতি পেয়েছিলেন, তিনি দীর্ঘ সময় লাইমলাইটের বাইরে ছিলেন। কয়েক বছর আগে ‘মেয়েবেলা’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে ছোট পর্দায় তাঁর ক্ষণিক উপস্থিতি দর্শকদের মনে আশা জাগালেও, বর্তমানে তিনি আবারও অভিনয় জগত থেকে দূরে সরে গিয়েছেন। অন্যদিকে, দেবিকা মুখোপাধ্যায় ‘ছোট বউ’ ছবির মাধ্যমে যে আইকনিক ইমেজ তৈরি করেছিলেন, তা ধরে রাখার মতো জোরালো চরিত্র পরবর্তী সময়ে তাঁর কাছে আর আসেনি বললেই চলে; ফলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বড় পর্দা বা টেলিভিশন কোথাও তাঁর আর উল্লেখযোগ্য কোনো উপস্থিতি নেই।

ব্যতিক্রম হিসেবে চুমকি চৌধুরীকে আজও আমরা টেলিভিশনের পর্দায় নিয়মিত অভিনয় করতে দেখি ঠিকই, কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা ছিল স্পষ্ট। ‘মেজ বউ’ ছবিতে সাফল্যের পর তিনি মূলত তাঁর বাবা অঞ্জন চৌধুরীর ঘরানা এবং নিজস্ব প্রোডাকশনের গণ্ডিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু এত জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরেও কেন তিন অভিনেত্রী হঠাৎ করে হারিয়ে গেলেন বড় পর্দার সেই লাইম লাইন থেকে।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বিপুল জনপ্রিয়তার পর এই অভিনেত্রীরা ব্যক্তিগত জীবন বা সংসারকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অভিনয় কমিয়ে দিয়েছিলেন। চুমকি চৌধুরী যেমন নিজের বাবার প্রোডাকশনের বাইরে খুব একটা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না, তেমনি দেবিকা মুখোপাধ্যায় বা রত্না সরকারও ইন্ডাস্ট্রির ইঁদুর দৌড় থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

আরও পড়ুনঃ না জানিয়েই অ’স্ত্রোপচার করে জরায়ু অপসারণ! মাতৃত্ব কেড়ে নিয়ে ব’ন্ধ্যাত্বের য’ন্ত্রণায় বিস্ফোরক উদিত নারায়ণের প্রথম স্ত্রী! গায়ক ও তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে কাঠগড়ায় তুললেন রঞ্জনা!

সিনেমা বা সিরিয়াল ইন্ডাস্ট্রিতে মেধার চেয়েও অনেক সময় লবি বা গোষ্ঠীবাজি বড় হয়ে দাঁড়ায়, যা এই তিন অভিনেত্রীর ক্ষেত্রেও ঘটা অসম্ভব নয়। অঞ্জন চৌধুরীর ছবিগুলো যখন বাংলা সিনেমার হাল ধরেছিল, তখন ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে একটি বিশেষ ঘরানার আধিপত্য তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট পরিচালক বা প্রোডাকশন হাউসের তকমা লেগে গেলে অন্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো সেই অভিনেতাদের কাজ দিতে চাইত না। রত্না সরকার বা দেবিকা মুখোপাধ্যায়রা কি এই ধরণের নোংরা রাজনীতির শিকার? তারা কি আপস করতে চাননি বলেই নীরবে সরে দাঁড়িয়েছিলেন?

Back to top button