‘জয়েন্টের খাতায় লিখেছিলাম আসছে বছর আবার হবে’, ‘জানিনা জীবন আমাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেবে কিনা…’ না, জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়নি! বিপদ জানা সত্ত্বেও নিরাপত্তাহীনতার মাঝে ফেলে কিছুটা মে’রেই ফেলা হলো অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়কে!

টলিউড (Tollywood) আজ এক উজ্জ্বল নক্ষত্রহীন। অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) অকাল প্রয়াণ মেনে নিতে পারছেন না তাঁর অগণিত অনুরাগী ও সহকর্মীরা। কিছুদিন আগেই ওড়িশার তালসারিতে শ্যুটিং চলাকালীন এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় (সমুদ্রে ডুবে) প্রাণ হারান এই প্রতিভাবান অভিনেতা। তাঁর চলে যাওয়া টলিউডের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে মৃত্যুর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের জীবনের এমন কিছু মজার অথচ আবেগপ্রবণ ঘটনার কথা শুনিয়েছিলেন, যা আজ তাঁর স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে অনুরাগীদের মনে।
রাহুল তাঁর ছাত্রজীবনের এক অবাক করা গল্প শুনিয়েছিলেন। জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার কথা বলতে গিয়ে তিনি হেসে বলেছিলেন, প্রশ্নপত্র দেখে তিনি অংকের কোনো চ্যাপ্টারই চিনতে পারছিলেন না। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে খাতার পাতায় কোনো উত্তর না লিখে বড় বড় করে লিখে দিয়েছিলেন “আসছে বছর আবার হবে”। এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী দাদার ভাই হয়েও পড়াশোনার চাপে নয়, বরং নিজের মনের তাগিদেই তিনি এমন কাণ্ড ঘটিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।
সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অভিনেতা আরও একটি আবেগঘন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানতেন, পরীক্ষার হলের বাইরে তাঁর মা ডাব হাতে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। মা যাতে দুঃখ না পান বা ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করেন, তাই নিজের হাতে কালির দাগ মেখে বাইরে বেরিয়েছিলেন রাহুল। বাড়িতে ফিরে মায়ের কাছে নিজেকে একজন সিরিয়াস পরীক্ষার্থী হিসেবে প্রমাণ করার সেই চেষ্টা আজ ভাবলে অনেকেরই চোখ ভিজে আসে। মায়ের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধই তাঁকে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল।
রাহুলের ব্যক্তিগত জীবন সবসময়ই চর্চার কেন্দ্রে ছিল। ২০০৮ সালে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির হাত ধরে তাঁর জয়যাত্রা শুরু। সেই ছবির সহ-অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সাথে তাঁর প্রেম ও বিয়ে ছিল টলিউডের অন্যতম আলোচিত বিষয়। তাঁদের একটি পুত্রসন্তানও রয়েছে, যার নাম সহজ। দীর্ঘ চড়াই-উতরাই এবং সাময়িক বিচ্ছেদের পর সাম্প্রতিক সময়ে আবারও তাঁরা একে অপরের কাছাকাছি আসছিলেন, যা ভক্তদের মনে আনন্দের সঞ্চার করেছিল। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই পূর্ণতা পাওয়ার আগেই থেমে গেল রাহুলের পথচলা।
আরও পড়ুনঃ ‘নিরাপত্তা ছিল না এটা মানতে নারাজ!’ টলিউডের সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়ে বিস্ফোরক রাজ চক্রবর্তী!
অভিনয় ছিল তাঁর সহজাত। প্রথম অডিশনেই ‘মানিক’ ধারাবাহিকের জন্য নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে সিনেমা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নিজের দাপট বজায় রাখা রাহুল ছিলেন একজন সত্যিকারের শিল্পী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্যামেরার সামনে বা নাটকের মঞ্চে তাঁর এক ধরনের ‘চুম্বকীয় আকর্ষণ’ কাজ করে। তাঁর সেই অভিনয়ের জাদু আর সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব বাংলা সিনেমা প্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আর তাঁর জীবনের এই ছোট ছোট গল্পগুলোই হবে আগামীর প্রেরণা।

