‘তখনও ঋতুপর্ণা এতটা এন্ট্রি নেয়নি…আমার ৫টি সিনেমা চলে যায় ঋতুপর্ণার ঝুলিতে!’ কেরিয়ারের মধ্যগগনে হারিয়ে গেলেন ‘ছোট বউ’? প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জির সঙ্গে আর জুটি বাধা হলো না দেবিকা মুখার্জির! মুখ খুললেন অভিনেত্রী!

নব্বইয়ের দশকের বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দক্ষ অভিনেত্রী দেবিকা মুখার্জি (Devika Mukherjee)। ‘ছোট বউ’ সিনেমার সেই সরল, শান্ত মেয়েটির অভিনয় আজও বাঙালির মনে গেঁথে রয়েছে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর অনস্ক্রিন রসায়ন তৎকালীন সময়ে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিল। কিন্তু সাফল্যের শিখরে থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করেই যেন ইন্ডাস্ট্রি থেকে হারিয়ে যান এই অভিনেত্রী। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে নিজের কেরিয়ার এবং তৎকালীন টলিউড ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে একগুচ্ছ বিস্ফোরক ও বিতর্কমূলক মন্তব্য করেছেন দেবিকা মুখার্জি, যা নিয়ে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া এবং সিনেমা মহলে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে।
অভিনেত্রীর সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত অভিযোগটি ছিল টলিউডের অভ্যন্তরীণ লবিইজম বা দলবাজি নিয়ে। দেবিকা মুখার্জি সরাসরি দাবি করেছেন, ‘ছোট বউ’ সিনেমাটি সুপারহিট হওয়ার পর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর জুটিকে দর্শক দারুণ পছন্দ করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর আরও অনেকগুলো সিনেমায় লিড রোল পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের কিছু অদৃশ্য সমীকরণ এবং লবিইজমের কারণে রাতারাতি তাঁর হাত থেকে বহু প্রজেক্ট ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কোনো বিশেষ দলের অংশ না হওয়ার কারণে তাঁকে কোণঠাসা করে দেওয়া হয়েছিল, যা তাঁর কেরিয়ারের গ্রাফ চিরতরে বদলে দেয়।
এই বিতর্কের আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম শীর্ষ অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে নিয়ে করা তাঁর মন্তব্যটি। দেবিকা মুখার্জি জানান, সেই সময়ে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত মাত্র ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করছিলেন এবং খুব দ্রুত বড় বড় প্রজেক্ট নিজের নামে করতে শুরু করেন। দেবিকার কথায়, ঋতুপর্ণা তখনও পুরোপুরি ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জমি শক্ত করতে পারেননি, অথচ দেবিকার পাওয়ার কথা ছিল এমন অন্তত পাঁচটি বড় সিনেমা সরাসরি ঋতুপর্ণা বা অন্যান্য অভিনেত্রীদের ঝুলিতে চলে যায়। এই মন্তব্যটির পর নেটিজেনদের একাংশ মনে করছেন, দেবিকা আসলে নাম না করে তৎকালীন সময়ে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এবং প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র আধিপত্য লবির দিকেই আঙুল তুলেছেন।
দেবিকা মুখার্জির এই বিস্ফোরক বয়ান সামনে আসার পর থেকেই টলিউড দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। সাধারণ দর্শক এবং অনুরাগীদের একটা বড় অংশ অভিনেত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের মতে, নব্বইয়ের দশকে টলিউডে কাস্টিং কাউচ বা লবিইজম চরম পর্যায়ে ছিল, যার শিকার হতে হয়েছিল দেবিকা মুখার্জির মতো প্রতিভাবান অভিনেত্রীকে। অন্যদিকে, ইন্ডাস্ট্রির একাংশের দাবি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাস্টিংয়ের সমীকরণ বদলায়, পরিচালকরা নতুন মুখ খুঁজতে চান, তাই একে লবিইজম বলা ভুল। তবে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের মতো একজন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রীর সাফল্যকে এভাবে কাঠগড়ায় তোলায় অনেকেই দেবিকার এই বক্তব্যকে ‘ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ বলেও মন্তব্য করেছেন।
আরও পড়ুনঃ ‘আজকের সুপারস্টার ঋতুপর্ণাকে প্রথম সুযোগ আমিই দিয়েছিলাম! আমি বলেছিলাম বলেই ও আজ…’ রত্না ঘোষালের হাত ধরেই ইন্ডাস্ট্রিতে হাতেখড়ি ঋতুপর্ণার! সেই ঘটনাই দর্শকদের জানালেন প্রবীণ অভিনেত্রী!
পরিশেষে বলা যায়, দেবিকা মুখার্জির এই সাক্ষাৎকারটি টলিউডের চকচকে পর্দার পিছনের এক অন্ধকার অধ্যায়কে আবারও সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে। কেরিয়ারের মধ্যগগনে থেকে কেন একজন সফল অভিনেত্রীকে কাজ না পেয়ে বসে থাকতে হলো, সেই প্রশ্নটি আরও একবার জোরালো হয়ে উঠেছে। এই বিতর্ক কেবল দেবিকা মুখার্জি বা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা ইন্ডাস্ট্রির স্বজনপোষণ এবং রাজনীতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। দেবিকার এই সরল কিন্তু ধারালো বক্তব্য আগামীদিনে টলিউডের অন্দরের সমীকরণকে কতটা প্রভাবিত করে, সেটাই এখন দেখার।

