অভিনয় থেকে প্রযোজনা সবেতেই সেরা! তার হাতেই তৈরি উত্তম কুমার! কেমন ছিল জনদরদী অভিনেতা তথা পরিচালক বিকাশ রায়ের শেষ জীবন?

সালটা ছিলো ১৯১৬, ১৬ই মে বাংলার ঘরে জন্ম নিল বাংলা চলচ্চিত্র জগতের পরবর্তী সময়ের প্রতিভাবান অভিনেতা বিকাশ রায়। কলকাতার ভবানীপুরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার। কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করার পর এলএলবি নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। পড়াশোনা শেষ করার পর বেশ কিছুদিন আলিপুর কোর্টে তিনি প্র্যাকটিস করেছিলেন। এরপরে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যোগদান করেন তিনি। রেডিওতে কাজ করতে করতে অভিনয় জগতে কাজের সুযোগ আসে বিকাশ রায়ের কাছে। তিনি আকাশবাণীর জন্য বেশ কয়েকটি রেডিও নাটকও করেছিলেন।

এরপর ‘৪২’ ছবিতে একজন নির্মম, অত্যাচারী সামরিক অফিসারের ভূমিকায় অভিনয় করে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ওই ছবিতে অত্যাচারী অফিসার ত্রিবেদীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিকাশ রায়। সেই ছবিতে অভিনেতার অভিনয় এতটাই জীবন্ত লেগেছিল দর্শকের কাছে যে একদল দর্শক স্টুডিওতে ছুটে এসেছিলেন বিকাশ বাবুকে মারার জন্য। আর এরকম কোন ঘটনা ঘটলে অভিনেতার অভিনয় তখনই সার্থক হয়। ঐদিন বিকাশ বাবুকে একজন দর্শক জুতো ছুড়ে মেরেছিলেন সেই জুতো মাথায় করে নিয়ে বিকাশ বাবু বলেছিলেন আজ আমার অভিনয় সার্থক হল।

‘আরোগ্যনিকেতন’ ছবির জীবনমশাই চরিত্র হোক কিংবা ‘উত্তরফাল্গুনী’র স্বার্থহীন প্রেমিক মনীশ সব চরিত্রেই সাবলীল ছিলেন অভিনেতা। পরে ‘ছদ্মবেশী’ ছবিতে খামখেয়ালি কিন্তু আদরণীয় ব্যারিস্টার প্রশান্ত ঘোষের ভূমিকায় বিকাশ রায়ের অসামান্য অভিনয় চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বিকাশ রায়ের মোট ২৪৮ টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। অভিনেতার অভিনীত আরও বেশ কিছু ছবি হল মাস্টারদা সূর্য সেন, ভুলি নাই, রত্নদীপ, টাকা আনা পাই, কীর্তিগড়, রাত্রির তপস্যা, ধুলি, শাপ মোচন, সাজঘর, অভয়ের বিয়ে, জীবন কাহিনী, জীবন তৃষ্ণা ইত্যাদি। উত্তম কুমারের মতো তাঁরও শেষ ছবি ‘ওগো বধূ সুন্দরী’। অভিনয় করেছিলেন স্নেহময়ী দাদুর ভূমিকায়।

১৯৬১ সালে পশ্চিমবঙ্গের দুটি জেলা ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, ভেসে গিয়েছিল সব। বাংলার সাধারণ মানুষ এগিয়ে এলেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ত্রাণের সাহায্যে। সাধারণ মানুষকে দেখে অভিনয় জগতের মানুষেরাও পিছিয়ে রইলেন না। তাঁরাও এগিয়ে এলেন সাহাযার্থে। বন্যাত্রাণের জন্যে চলচ্চিত্র মহল ঠিক করল অর্থ সংগ্রহের জন্য কলকাতার রাজপথে তারা মিছিল করে বেরােবেন। এই দায়িত্ব পড়ল অভিনেতা বিকাশ রায়ের ওপর।

সেই পথপরিক্রমার জন্যে শিল্পীদের যে তালিকা তৈরি হল তাতে উত্তমকুমারের নাম বাদ রাখা হল। কারণ উত্তমকুমার রাস্তায় নামলে এত ভিড় হবে যে তা সামলাতে হিমসিম খেতে হবে। ফলে অর্থসংগ্রহের আসল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। কিন্তু উত্তম কুমার রাজি হলেন না, জোর করে আসলেন সেই মিছিলে। উত্তম কুমারকে একটি লরির উপর রাখা হল হাতে একটি কৌটো নিয়ে। ভিড় জনতার মাঝে হঠাৎ বিকাশ রায় বলে উঠলেন এবং জনতার হাতে ধরা এক দু’টাকার নােটগুলি প্রায় ছিনিয়ে নিতে নিতে বলতে লাগলেন-”উত্তমের কৌটোর ভ্যালু কি ওই এক টাকা দু-টাকা নাকি? তার জন্য পাঁচ-দশ টাকার নোট বের করুন। এগুলি সব আমার প্রাপ্য।”

আরও পড়ুন: প্রকাশ্যে প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদন করলেন ঋত্বিক! অভিনেতার প্রেয়সীকে দেখলে চমকে যাবেন আপনিও!

বিকাশ রায় অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছবির প্রযোজনা, পরিচালনা, কাহিনি-রচনা ও চিত্রনাট্য রচনাও করেছেন। সিনেমার পাশাপাশি থিয়েটার মঞ্চেও দাপিয়ে অভিনয় করেছেন। তবে দুঃখের বিষয় হল অভিনেতা জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে কোন সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ১৯৮৭ সালে ১৬ এপ্রিল ৭১ বছর বয়সে প্রতিভাশালী অভিনেতার মৃ’ত্যু হয়।

Back to top button