সুরে সুরেই মিলেছিল দুটি মন! সুরেই প্রেম আর প্রেমেই সঙ্গীত! আশা ভোঁসলে ও পঞ্চমের অমলিন গল্প আজও জীবন্ত মানুষের হৃদয়ে!

ভারতীয় সঙ্গীত জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে বিদায় নিয়েছেন Asha Bhosle। ৯২ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণ যেন শুধু এক শিল্পীর বিদায় নয়, বরং এক যুগের অবসান। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর কণ্ঠে ভেসে উঠেছে অসংখ্য অমর গান, যা আজও মানুষের মনে একই রকম আবেগ জাগায়। তাঁর গানের ভাণ্ডার শুধু সুরের সমাহার নয়, বরং তা ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। সেই সুরের ভুবনে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী ছিলেন Rahul Dev Burman, যিনি পঞ্চম দা নামেই বেশি পরিচিত।
আশা এবং পঞ্চমের জুটি ভারতীয় সঙ্গীতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। ‘পিয়া তু আব তো আজা’ থেকে ‘দম মারো দম’, প্রতিটি গানেই ছিল এক অনন্য সাহসী ভাবনা এবং আধুনিকতার ছোঁয়া। সেই সময়ের প্রচলিত ধারা ভেঙে নতুন সাউন্ড এবং রিদম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন পঞ্চম, আর সেই সৃষ্টিকে প্রাণ দিয়েছিলেন আশার কণ্ঠ। তাঁদের এই সৃষ্টিশীল বন্ধনই ভারতীয় প্লেব্যাক সঙ্গীতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। গানের মাধ্যমে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে সঙ্গীত শুধু বিনোদন নয়, বরং এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম।
শুধু পেশাগত সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না তাঁদের বন্ধন। দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করতে করতে তাঁদের সম্পর্ক গড়ায় ভালোবাসায়। যদিও শুরুতে আশার জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে দ্বিতীয়বার সম্পর্কে জড়াতে দ্বিধায় ফেলেছিল, তবুও পঞ্চমের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাঁকে জয় করে নেয়। শোনা যায়, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে না পেরে পঞ্চম নাকি নিয়ম করে আশাকে গোলাপ পাঠাতেন। এমনই মজার এবং আবেগঘন ছোট ছোট মুহূর্তে গড়ে উঠেছিল তাঁদের সম্পর্ক, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৮০ সালে বিবাহে পরিণতি পায়।
তাঁদের সম্পর্কের ভিত ছিল একটাই, আর তা হল সঙ্গীত। পশ্চিমী সুর থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, সবকিছু নিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা, শোনা এবং চর্চা করতেন তাঁরা। জন কোল্ট্রেন থেকে বিটলস, কিংবা ভারতীয় ধ্রুপদী সুর, সবকিছুতেই ছিল তাঁদের সমান আগ্রহ। এই মিলই তাঁদের সম্পর্ককে গভীর করেছে। কাজের ফাঁকে পঞ্চমের দুষ্টুমি, কিংবা আশার খুনসুটি, সব মিলিয়ে তাঁদের দাম্পত্য ছিল একেবারে আলাদা ছন্দে বাঁধা।
আজ যখন আশা ভোঁসলে আর আমাদের মধ্যে নেই, তখন তাঁর গানই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্মারক। আর সেই স্মৃতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন পঞ্চম দা। সুর আর ভালোবাসার এই অদ্ভুত মেলবন্ধনই তাঁদের অমর করে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে মানুষ হারিয়ে যায়, কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি থেকে যায় চিরকাল। তাই হয়তো আজও মনে হয়, কোথাও না কোথাও আবার মিলিত হবেন আশা আর পঞ্চম, আর সেই মিলনে আবার ভেসে উঠবে সুরের জাদু।

