তাঁর কণ্ঠের নেশায় ডুবে ছিল গোটা দেশ! একটু একটু করে বেঁধেছিলেন তাঁর সুরের ভেলা! কিভাবে এক সাধারণ মেয়ে থেকে কিংবদন্তি শিল্পী হয়ে উঠলেন আশা ভোঁসলে? জেনে নিন স্বর্গীয় গায়িকার অসাধারণ জীবন কাহিনী!

আশির দশকের এক শীতল জ্যোৎস্না রাত, শহরতলির মঞ্চে চলছিল সারারাতের অনুষ্ঠান, আর সেখানে বারবার ফিরে আসছিল এক কণ্ঠের জাদু। কভার গানের শিল্পীরা গাইছিলেন তাঁর গান, কিন্তু প্রতিটি সুরে যেন ভেসে উঠছিলেন একটাই নাম, আশা ভোঁসলে। মঞ্চে আলো, কৃত্রিম ধোঁয়া আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসের মধ্যে তাঁর গানের আবেশ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা মুছে গিয়েছিল। সেই সাধারণ মানুষের ভিড়ে কেউ হয়তো কখনও তাঁকে সামনে থেকে দেখেননি, তবু তাঁর কণ্ঠই ছিল তাদের রাতভর সঙ্গী। এইভাবেই দূরত্ব পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।

ভারতীয় সঙ্গীত জগতে আশা ভোঁসলের যাত্রা শুরু হয়েছিল কঠিন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। ১৯৩৩ সালে সাঙ্গলিতে জন্ম, বাবা দীননাথ মঙ্গেশকরের মৃত্যু পর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই শুরু হয় সঙ্গীতের পথচলা। প্রথমে ছোট সুযোগ, তারপর ধীরে ধীরে বড় মঞ্চ, এইভাবেই নিজেকে তৈরি করেছেন তিনি। শুরুটা সহজ ছিল না, কিন্তু নিজের পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে। সেই পথচলা একদিন ইতিহাস হয়ে উঠবে, তখন হয়তো তিনিও ভাবেননি।

ষাট ও সত্তরের দশকে তাঁর কণ্ঠে আসে এক নতুন মোড়, বিশেষ করে রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তাঁর কাজ ভারতীয় সঙ্গীতকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ‘দম মারো দম’ বা ‘পিয়া তু আব তো আজা’র মতো গান শুধু জনপ্রিয় হয়নি, সময়ের ধারা বদলে দিয়েছিল। পাশ্চাত্য সুর, নতুন পরীক্ষা, আর সাহসী উপস্থাপনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অন্যরকম শিল্পী। একই সঙ্গে গজল বা শাস্ত্রীয় ঘরানাতেও সমান দক্ষতা দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেন তাঁর কণ্ঠের বহুমুখিতা। এই বৈচিত্রই তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে অন্যদের থেকে।

বাংলা গানেও তাঁর অবদান কম নয়, পুজোর মণ্ডপ থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে তাঁর গান আজও সমান জনপ্রিয়। ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’ কিংবা ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’ এখনও শোনা যায় বারবার। শুধু হিন্দি নয়, আঞ্চলিক ভাষাতেও তাঁর উপস্থিতি ছিল সমান শক্তিশালী। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তাঁর গান থেকে গেছে মানুষের আবেগে। এমনকি বয়সের শেষ প্রান্তেও নতুন সুরের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর, যা খুব কম শিল্পীর মধ্যেই দেখা যায়।

আরও পড়ুন: ‘১৩ বছরের বাচ্চাকে করতে হচ্ছে বাবার শেষকৃত্য! আমি ভাবতেই পারছি না…’ কান্নায় ভেঙে পড়লেন অভিনেত্রী চৈতালী চক্রবর্তী!

আজ তাঁর প্রয়াণে যেন থমকে গেছে এক সময়ের সুর। পুরস্কার, সম্মান, রেকর্ড সবকিছু ছাপিয়ে তিনি ছিলেন মানুষের হৃদয়ের শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত টান, যা মানুষকে আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। শেষ জীবনে তিনি অনেকটাই নিঃশব্দ হয়ে গেলেও তাঁর গান আজও বেঁচে আছে। সেই সুরই বারবার মনে করিয়ে দেবে, তিনি কোথাও যাননি, রয়ে গেছেন প্রতিটি সুরে, প্রতিটি স্মৃতিতে।

Back to top button