‘অভিনয় জানি না বলে সেট থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল!’ চোখে জল নিয়ে ফিরেছিলেন সেদিন! আজ তিনি সকলের অন্যতম প্রিয় অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী!

জনপ্রিয় অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী (Arjun Chakraborty) বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বর্ণময় নাম। যার অভিনয় জীবনের শুরুটা হয়েছিল ক্যামেরার নেপথ্যে, একজন সহকারী পরিচালক হিসেবে। রাজস্থানের উদয়পুরের কলেজে পড়াশোনা শেষ করে তিনি মুম্বাই পাড়ি জমান কিংবদন্তি পরিচালক গুলজার সাহেবের হাত ধরে। উটের পিঠে চড়া দুরন্ত শৈশব কাটানো এই মানুষটির রক্তে ছিল শিল্প। গুলজার সাহেবের ‘আঙ্গুর’ ছবিতে আচমকাই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান তিনি, আর সেই থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ জয়যাত্রা। সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তার জীবনের উত্থান-পতন, ছয় বছরের দীর্ঘ বিরতি এবং নতুন ছবি ‘ফুলপিসি’ নিয়ে মনখোলা আলোচনা করেছেন, যা পাঠকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

অর্জুন চক্রবর্তীর ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরে যখন তিনি কলকাতায় এসে মৃণাল সেনের ‘একদিন আচানক’ ছবিতে কাজ করেন। মুম্বাইয়ে সহকারী হিসেবে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও কলকাতায় আসার পর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ছয়টি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পান তিনি। মৃণাল সেন মজা করে তাকে বলতেন ‘আমাদের রাজেশ খান্না’। সেই সময় ‘দেবতা’ বা ‘সাঁথী’র মতো বাণিজ্যিক ছবি থেকে শুরু করে সৃজনশীল সিনেমার জগতে অর্জুন চক্রবর্তী হয়ে ওঠেন এক অপরিহার্য নাম। তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। একসময় একটি ছবির শুটিং থেকে তাকে এই বলে বের করে দেওয়া হয়েছিল যে তিনি ‘অভিনয় পারেন না’। সেই চরম অপমান তাকে ভেঙে না দিয়ে বরং কলকাতায় থেকে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার শক্তি জুগিয়েছিল।

কিংবদন্তি পরিচালক তপন সিনহার সাথে অর্জুন চক্রবর্তীর সম্পর্ক ছিল অম্ল-মধুর। একসময় কাজের সন্ধানে তপন সিনহার বাড়ি গেলে তাকে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কটু কথা বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা অভিনেতার চোখে জল এনে দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর তপন সিনহা নিজেই তাকে ফোন করে ক্ষমা চান এবং ‘অন্তর্ধান’ ছবিতে এক অবিস্মরণীয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন। অর্জুন চক্রবর্তী জানান, পরিচালকের স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে সেদিন তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। তপন সিনহার মতো মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া এবং তার অধীনে অভিনয় শেখা অর্জুনের জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি, যা তাকে একজন প্রকৃত শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

মাঝখানে প্রায় ছয় বছর বড় পর্দা থেকে দূরে ছিলেন এই গুণী অভিনেতা। অফার অনেক থাকলেও মনের মতো চরিত্রের অভাবে তিনি নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। এই সময়টি তার জন্য মানসিকভাবে কিছুটা কষ্টের হলেও তিনি থেমে থাকেননি। নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছিলেন গান, কবিতা আর উপন্যাস লেখার মাঝে। তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর কাছে অভিনয়ের খিদে সবসময় থাকে, আর সেই খিদে মেটানোর মতো শক্তিশালী চরিত্র না পাওয়াই ছিল তার এই দীর্ঘ বিরতির মূল কারণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থেকে তিনি তার ভক্তদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন এবং নিজের উপলব্ধিগুলো শেয়ার করেছেন, যা তাকে জনমানসে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

আরও পড়ুনঃ ‘মিঠুনদার ডাকেই আসা, টলিউড তো…’ ‘অন্যায় মেনেছি কিন্তু প্রতিবাদ থামাইনি!’ টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুললেন লকেট চট্টোপাধ্যায়!

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর উইন্ডোজ প্রোডাকশনের ‘ফুলপিসি’ ছবির মাধ্যমে তিনি আবার বড় পর্দায় ফিরছেন। এই ছবিতে তিনি একজন দাপুটে জমিদারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অর্জুন চক্রবর্তীর মতে, পোশাকের একটা আলাদা মেজাজ থাকে যা অভিনয়কে প্রভাবিত করে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছ থেকে তিনি প্রতিনিয়ত শিখছেন এবং তাদের কাজের পদ্ধতিতে তিনি মুগ্ধ। জীবনের এই পর্যায়ে এসেও তিনি নিজেকে একজন ‘নিউ কামার’ বা নবাগত মনে করেন। এই বিনয় এবং অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাকে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় বসিয়ে রেখেছে। ভক্তরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের প্রিয় অভিনেতাকে আবার বড় পর্দায় এক নতুন অবতারে দেখার জন্য।

Back to top button