‘গান লিখবি! বাজারে চলবে?’, ‘সিনেমার গান তৈরি করা এখন এক ধরণের দাসত্ব’, ‘টাকার জোরেই ভিউ আর মিলিয়ন মিলিয়ন হিট!’, ‘ নতুনদের উদ্দেশ্যে বলছি, এই পেশায়…’ শুধু গান লিখে কি এই সমাজে বেঁচে থাকা যায়? পরিচালকদের ব্যবসায়িক মানসিকতা নিয়ে বি’স্ফোরক অনুপম রায়!

বর্তমান সময়ের তরুণ সংগীতশিল্পীদের কাজের ধরন, আধুনিক মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির কঠিন বাস্তবতা এবং বাংলা গানের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল নিয়ে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের খোলামেলা মতামত জানিয়েছেন দুই বাংলার অত্যন্ত জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সুরকার অনুপম রায় (Anupam Roy)। একটি পডকাস্ট শোতে আলোচনায় তিনি নতুন প্রজন্মের সংগীত ভাবনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। অনুপম রায় মনে করেন, নতুনদের মধ্যে কাউকে অন্ধভাবে অনুকরণ করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কেবল পূর্বসূরিদের চেনা সুরের পুনরাবৃত্তি না করে, সবকিছু ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন এক সৃষ্টির জোয়ার আনলেই বাংলা গানের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আজকের ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে গান প্রচারের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, যা তরুণদের জন্য একটি দারুণ সুযোগ তৈরি করেছে। একসময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো প্রতিভাবান শিল্পীকে নিজের গান মানুষের কাছে পৌঁছাতে আকাশবাণীতে অডিশন দিতে হতো কিংবা বড় কোনো ক্যাসেট বা সিডি কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হতো। আজ উত্তরবঙ্গের কোনো অজপাড়াগাঁয়ের ছেলেও চাইলে ঘরে বসে একটা গিটার বাজিয়ে নিজের গান ইউটিউব বা ফেসবুকে আপলোড করে দিতে পারছে। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা প্ল্যাটফর্মের দিক থেকে সবাইকে সমান সুযোগ করে দিলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক চরম বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, যা সাধারণ দর্শকদের আড়ালেই থেকে যায়।
ইন্ডাস্ট্রির এই নেপথ্য বাস্তবতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনুপম রায় এক বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন সবাইকে। তিনি জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় আজ আমরা যেসব গানের মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ বা বিপুল আলোড়ন দেখি, তার সিংহভাগই আসলে বড় বড় মিউজিক কোম্পানির বিপুল অর্থ বিনিয়োগ ও শক্তিশালী মার্কেটিং টিমের ফসল। পুঁজিহীন বা স্বাধীন একজন সাধারণ শিল্পীর পক্ষে এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। ফলে কেবল সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম বা ভাগ্যের ওপর ভরসা করে নোটিসড হওয়া বা শ্রোতাদের নজরে পড়াটা বর্তমানে এক প্রকার অলৌকিক ঘটনার মতোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিনেমার গান তৈরির ক্ষেত্রেও এই বাণিজ্যিক চাপ এবং ফর্মুলা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা অনেক সময় সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই সুরকার। প্রযোজক ও পরিচালকেরা সাধারণত আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে অনুপম রায়ের কাছে তার অতীতের সুপারহিট গানগুলোর মতোই সুরের পুনরাবৃত্তি চান। কিন্তু একজন খাঁটি শিল্পী হিসেবে একই ধাঁচের সুর বারবার তৈরি করা তার নিজের কাছেও এক প্রকার দাসত্ব বলে মনে হয়। অনুপম স্পষ্ট জানান, সমাজ ও চলচ্চিত্রের ভাষা না পাল্টালে গানের ভাষা একার চেষ্টায় পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, কারণ গান তো সিনেমার গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই সমস্ত দায়বদ্ধতার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মনের মতো সুর সৃষ্টির জন্য তিনি পূজোর আধুনিক গানের অ্যালবামের প্রতি বেশি জোর দিচ্ছেন।
আরও পড়ুনঃ ‘আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমায় কোন খারাপ কথা…’ ‘বয়স বাড়লে কি স্বাদ-আহ্লাদ মরে যায়?’ ‘ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই শুধু তেল দিতে ব্যস্ত!’ শ’ত্রুতা ভুলে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর পাশে শ্রীলেখা মিত্র!
বিশ্বমঞ্চে বাংলা গানের এক্সপোজার এবং আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করার প্রসঙ্গে অনুপম অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কলকাতায় বড় হওয়া এবং এই অঞ্চলের মাটির সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার কারণেই তিনি বাংলা গানে জীবনমুখী আবেগ ফুটিয়ে তুলতে পারেন। জোর করে ইংরেজি গান লিখে পশ্চিমা শ্রোতাদের প্রভাবিত করা সম্ভব নয়, কারণ তাদের দৈনন্দিন জীবন ও মনের জটিলতা অনুধাবন করতে হলে সেই সমাজেই জন্মগ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। একই সাথে তিনি আমাদের দেশে তীব্র পরিকাঠামোর অভাব ও মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার সাথে লড়াই করার কষ্টের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ দেশে একজন প্রতিভাবান মানুষকে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে যে পরিমাণ অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়, তার ফলে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানোর আগেই অনেকে পরিশ্রান্ত ও নিঃশেষ হয়ে পড়েন।

