‘আমার নাম অনামিকা নয়, আমি…’, ‘আমার নামের জন্য বহু জায়গায় অসম্মানিত হয়েছি!’ ‘কাজ শেখানোর নামে মানসিক নি’র্যাতন চলত!’ ‘আমাকে নেবে না কারণ আমি সুন্দরী নই…’ টলিউডে এত বছরের অভিজ্ঞতা কেমন? বি’স্ফোরক অনামিকা সাহা!

বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের অন্যতম স্তম্ভ এবং খলনায়িকা ও মাতৃস্থানীয় চরিত্রে দশকের পর দশক পর্দা কাঁপানো প্রবীণ অভিনেত্রী অনামিকা সাহা (Anamika Saha) সম্প্রতি ডিজিটাল মাধ্যমে এক তুমুল ঝড় তুলেছেন। ইউটিউবের জনপ্রিয় টক-শোতে হাজির হয়ে তিনি তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনের বহু অজানা এবং অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে মুখ খুলেছেন। ১ ঘণ্টা ৩২ মিনিটেরও বেশি দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী নিজের কেরিয়ারের লড়াই, বৈষম্য এবং ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের কিছু চরম বাস্তবতাকে কোনো রাখঢাক না রেখেই জনসমক্ষে এনেছেন। তাঁর এই স্পষ্টবাদী বয়ান বর্তমান বিনোদন জগতে নতুন করে এক বড়সড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই অভিনেত্রী তাঁর নামের পদবি নিয়ে টলিউডে হওয়া তীব্র বৈষম্য ও জাত্যাভিমানের বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন। অনামিকা দেবী অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, শুধুমাত্র ‘সাহা’ পদবি হওয়ার কারণে কেরিয়ারের বিভিন্ন বাঁকে তাঁকে চরম মানসিক হেনস্থা ও অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। চলচ্চিত্র মহলের একাংশের আভিজাত্যের লড়াই ও সংকীর্ণ মানসিকতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে নির্দিষ্ট কিছু পদবির বাইরে অন্য কাউকে সহজে সমাদর করা হতো না। একজন যোগ্য ও প্রতিভাবান শিল্পী হওয়া সত্ত্বেও কেবল তাঁর পারিবারিক পদবি ‘সাহা’ হওয়ার কারণে কীভাবে স্টুডিও পাড়ায় তাঁকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই পুরোনো ক্ষত এবার প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন তিনি।

পদবি বিতর্কের রেশ ধরেই টলিপাড়ার ভেতরের তথাকথিত “র‍্যাগিং কালচার” বা নবাগতদের ওপর মানসিক নির্যাতন চালানোর নোংরা মানসিকতা নিয়ে সরব হয়েছেন অনামিকা সাহা। তিনি ফ্লোরের ভেতরের পরিবেশের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে জানান, নতুন বা উদীয়মান শিল্পীদের কাজ শেখানোর নামে বা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কীভাবে মানসিক হেনস্থা করা হতো, তা তিনি নিজে কাছ থেকে দেখেছেন এবং নিজেও তার শিকার হয়েছেন। সিনিয়রদের একাংশের এই চ্যাংড়ামো এবং নতুনদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সংস্কৃতি যে কোনো সুস্থ ইন্ডাস্ট্রির লক্ষণ নয়, তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট বলেন, এই ধরনের হেনস্থার সংস্কৃতি বহুবছর ধরে টলিপাড়ার অন্দরে শিকড় গেড়ে বসে রয়েছে, যা অনেক প্রতিভাকে শুরুতেই অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেয়।

তবে কেবল ইন্ডাস্ট্রির অন্ধকার দিকই নয়, নিজের অভিনয় জীবনের এক নতুন অধ্যায় বা ‘সেকেন্ড ইনিংস’ নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং আশাবাদী কথা বলেছেন প্রবীণ এই অভিনেত্রী। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান সময়ে টলিউডে কাজের ধরন ও দৃষ্টিভঙ্গির যে বিবর্তন ঘটেছে, সেটিকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। বিশেষ করে ‘উইন্ডোজ প্রোডাকশন’-এর মতো আধুনিক এবং পেশাদার প্রোডাকশন হাউসের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয় জীবনের এই দ্বিতীয় ইনিংসে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। নতুন প্রজন্মের পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারদের গোছানো চিন্তাভাবনা এবং সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি তাঁদের দেওয়ার সম্মান তাঁকে ভীষণভাবে আপ্লুত করেছে।

আরও পড়ুনঃ শ’ত্রুদের ঘেরাটোপে পারুল-রায়ান! কালি মন্দিরের মানচিত্রেই লুকিয়ে আসল রহস্য! পারুলের হাত থেকে কি গুপ্তধন ছিনিয়ে নেবে সংযুক্তা? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

সাক্ষাৎকারের শেষে অনামিকা সাহা বিনোদন দুনিয়ার বর্তমান ধারা এবং প্রবীণ শিল্পীদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নিজের গভীর ভাবনা ভাগ করে নেন। তিনি একদিকে যেমন আধুনিক সিনেমার মেকিং ও টেকনিক্যাল অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন, ঠিক অন্যদিকে আজকের সিরিয়াল বা সিনেমার কিছু চারিত্রিক গভীরতার অভাব নিয়েও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, কাজের পরিবেশ ও প্রযুক্তি উন্নত হলেও আগের মতো আবেগের গভীরতা ও শক্তিশালী চরিত্রের বুনন এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তা সত্ত্বেও, কেরিয়ারের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জীবনের এই প্রান্তে এসে নতুনদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাওয়া এবং দর্শক মহলে আজও বিন্দুমাত্র ভালোবাসা না কমাকেই তিনি তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন।

Back to top button