‘আমার মতন অভিনেতাদের যোগ্য সম্মান নেই টলিউডে’- বাংলা ছবি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কমেডিয়ানদের গুরুত্ব! বি’স্ফোরক অভিনেতা শুভাশিস মুখোপাধ্যায়!

শুভাশিস মুখোপাধ্যায় (Subhasish Mukherjee) বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি কয়েক দশক ধরে তার অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মন জয় করে আসছেন। আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বইয়ের দশক এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি টলিউডের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিশেষ করে পিলে চমকানো কমেডি টাইমিং এবং ‘হারবার্ট’-এর মতো চলচ্চিত্রে তার সিরিয়াস অভিনয় দক্ষতা তাকে বাকিদের থেকে আলাদা করে তোলে। দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি অঞ্জন চৌধুরী, তরুণ মজুমদার থেকে শুরু করে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মতো ভিন্ন ধারার পরিচালকদের সাথে কাজ করেছেন। তবে একজন ভার্সেটাইল অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও তাকে অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু ছাঁচে বন্দি করে রাখা হয়েছে, যা নিয়ে তিনি সম্প্রতি মুখ খুলেছেন।
সাক্ষাৎকারে শুভাশিস বাবু ইন্ডাস্ট্রির একটি দীর্ঘদিনের মানসিকতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান যে, এক সময় প্রযোজক ও পরিচালকদের মধ্যে এক অদ্ভুত ধ্যান-ধারণা তৈরি হয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, যারা সাধারণত সিনেমায় সাইড রোলে কমেডি করেন, তাদের প্রধান চরিত্র বা লিড রোলে কাস্ট করা যাবে না। নির্মাতাদের এই সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে অনেক প্রতিভাবান কমেডি অভিনেতা যোগ্য সম্মান বা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ের মতে, অভিনেতাকে শুধুমাত্র ‘কমেডিয়ান’ তকমা দিয়ে আটকে রাখার ফলে বাংলা সিনেমার বৈচিত্র্য অনেকটা হারিয়ে গিয়েছে।
এই ধরনের ঝুঁকি না নেওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে তিনি বাণিজ্যিক ব্যর্থতার ভয়কে চিহ্নিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, প্রযোজক বা পরিচালকদের মনে সবসময় একটা আতঙ্ক কাজ করত যে, যদি কোনো কমেডিয়ানকে নিয়ে করা ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে, তবে তাদের বড়সড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। এই লোকসানের ভয়ে তারা নতুন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইতেন না। এর ফলে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস না দেখিয়ে তারা সেই পুরনো ও সেকেলে গল্পের ওপর ভিত্তি করে গতানুগতিক ধারার ছবি বানিয়ে যেতেন, যেখানে সফল হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, বর্তমানে বাংলা সিনেমায় কমেডিয়ান বা হাসির অভিনেতার কোনো অভাব নেই। তার সমসাময়িক অনেক অভিনেতা, যারা শুরুর দিকে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ পাননি, তারা এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা নতুন ধরণের সিনেমায় প্রচুর কাজ করছেন। এছাড়াও একঝাঁক নতুন প্রতিভাবান ছেলে এই পেশায় এগিয়ে আসছে, যা টলিউডের জন্য ইতিবাচক। তবে তার মতে, প্রতিভার প্রাচুর্য থাকলেও তাদের সঠিক ব্যবহারের অভাব এখনো রয়ে গিয়েছে, যার ফলে অনেক সৃজনশীল কাজ অংকুরেই বিনষ্ট হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ‘আমি গান গাইছি, উনি হুড়মুড় করে স্টেজে উঠে এলেন, ভয়ে গান থামিয়ে দিয়েছিলাম, তারপর…’ তারপর কি হয়েছিল গায়িকার সাথে? সেই অভিজ্ঞতাই ভাগ করে নিলেন হৈমন্তী শুক্লা!
অভিনেতা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, বর্তমান সময়ে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো ‘পারফেক্ট’ বা পরিপূর্ণ কমেডি ছবি তৈরি হচ্ছে না। এখনকার অধিকাংশ ছবিতেই কমেডিকে শুধুমাত্র পার্শ্ব উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু একটি আস্ত সিনেমাকে কেন্দ্র করে যেভাবে নির্মল হাসির গল্প বলা হতো, সেই ধারা এখন অনেকটাই স্তিমিত। গতানুগতিক স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সিনেমার মৌলিকত্ব নষ্ট হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, ইন্ডাস্ট্রিকে যদি আবার সজীব করে তুলতে হয়, তবে গতানুগতিকতার বাইরে বেরিয়ে অভিনেতাদের যোগ্য মর্যাদা দেওয়া জরুরি।

