শরীরে ক্যা’নসার! মনে অদম্য জেদ! নাট্যকার থেকে বিশ্বসেরা অভিনেতা! জেনে নিন চন্দন সেনের অজানা জীবন কাহিনি!

বাংলা সংস্কৃতি জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র চন্দন সেন (Chandan Sen)। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কখনও মঞ্চে, কখনও ছোট পর্দায় আবার কখনও সিনেমার রুপোলি পর্দায় নিজের অভিনয়ের জাদুতে দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছেন। কেবল অভিনেতা হিসেবেই নয়, একজন বলিষ্ঠ নাট্যকার ও নির্দেশক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি সর্বজনবিদিত। প্রতিকূলতাকে জয় করে কীভাবে একজন শিল্পী অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন, চন্দন সেন তার এক জীবন্ত উদাহরণ।
১৯৬৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের যশোরে চন্দন সেনের জন্ম। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা ও কর্মজীবনের অনেকটা জুড়েই রয়েছে কলকাতা। শৈশব থেকেই অভিনয়ের প্রতি এক অদম্য টান ছিল তাঁর। ১৯৭৭ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাংলা থিয়েটারে তাঁর পেশাদার পদার্পণ ঘটে। কিংবদন্তি নাট্য ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্ত এবং রামপ্রসাদ বণিকের কাছে অভিনয়ের পাঠ নিয়েছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে তিনি ‘নাট্য আনন’ থিয়েটার গ্রুপে সৃজনশীল পরিচালক এবং অভিনেতা হিসেবে যোগ দেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
১৯৭৭ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার থিয়েটারে পা রাখার পর থেকে তিনি অবিরাম নিজেকে ভেঙেছেন এবং গড়েছেন। নাট্যকার হিসেবে তিনি ১০০-এর বেশি নাটক রচনা করেছেন, যার মধ্যে দামিনী হে, দ্বি হুজুরের গপ্পো, জ্ঞানবৃক্ষের ফল এবং বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ-এর মতো সৃষ্টিগুলো বাংলা নাট্যজগতে মাইলফলক হয়ে আছে। মঞ্চের পাশাপাশি ছোট পর্দায় চন্দন সেন একজন অত্যন্ত পরিচিত মুখ। বিশেষ করে মেগা সিরিয়ালের জগতে তাঁর অভিনয় দক্ষতা তাঁকে আপামর বাঙালির ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিয়েছে।
ইষ্টি কুটুম, ইচ্ছে নদী, খড়কুটো, শ্রীময়ী, জল থৈ থৈ ভালোবাসা এবং সাম্প্রতিক সময়ের চিরসখা ধারাবাহিকে তাঁর উপস্থিতি গল্পের মানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কেবল নাটক বা সিরিয়াল নয়, বড় পর্দাতেও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০০২ সালে মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার দিয়ে শুরু করে হেরবার্ট, ম্যাডলি বাঙালি, ব্যোমকেশ বক্সী কিংবা মাটি প্রতিটি সিনেমাতেই তিনি প্রথাগত ছক ভেঙে অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে মানিকবাবুর মেঘ চলচ্চিত্রে তাঁর নীরব অথচ বাঙ্ময় অভিনয় তাঁকে রাশিয়ার প্যাসিফিক মেরিডিয়ান উৎসবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেরা অভিনেতার শিরোপা এবং ২০২৫ সালে ফিল্মফেয়ার ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড এনে দিয়েছে।
২০১০ সালে চন্দন সেনের জীবনে এক বড় বিপর্যয় নেমে আসে। তিনি ফলিকিউলার লিম্ফোমা নামক এক কঠিন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। কিন্তু মারণব্যাধি তাঁর অভিনয়ের জেদকে দমাতে পারেনি। কেমোথেরাপি চলাকালীন অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা নিয়েও তিনি মঞ্চে অভিনয় করেছেন। তাঁর এই লড়াই কেবল তাঁর নিজের জন্য ছিল না, ছিল শিল্পের প্রতি এক পরম দায়বদ্ধতা। দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি আজ ক্যানসার জয়ী।
আরও পড়ুনঃ মিঠির মনোবল ভাঙতে একজোট মামি, অনন্যা ও বর্ষা! মোক্ষম জবাব দিলো মিঠি! পাশে এসে দাঁড়াল মিটিল! দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
ব্যক্তিগত জীবনে চন্দন সেন একজন স্পষ্টবাদী মানুষ। তিনি বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে বরাবরই সরব। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ইন্টারনেটে নানা তথ্য পাওয়া যায়। শোনা যায়, ব্যক্তিগত জীবনে চন্দন সেন বর্তমানে কিছুটা একাকী জীবন যাপন করছেন। চন্দন সেন কেবল একজন অভিনেতা নন, তিনি এক অপরাজেয় সত্তা। তাঁর এই জীবনযুদ্ধ আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

