‘১৫ বছরের দুর্বিষহ য’ন্ত্রণার পর আজ আমি…’ ‘কাজ পেতে গেলে এই বয়সেই ‘বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু’ হতে হবে?’ টলিউডের অলিখিত চাহিদা নিয়ে মুখ খুললেন স্বর্ণকমল দত্ত!

বাংলা টেলিভিশন (Bengali Television) এবং চলচ্চিত্র জগতের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রতিভাবান একটি মুখ হলেন অভিনেত্রী স্বর্ণকমল দত্ত (Swarnakamal Dutta)। দীর্ঘ বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি তাঁর সাবলীল অভিনয় দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মনে এক আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন ধারাবাহিকে খলনায়িকার চরিত্র হোক কিংবা জটিল কোনো চরিত্রে তাঁর পর্দায় উপস্থিতি বরাবরই প্রশংসিত হয়েছে। সম্প্রতি স্টার জলসার ‘চিরসখা’র মতো প্রজেক্টে যুক্ত থেকে তিনি তাঁর পেশাদারিত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। বাস্তব জীবনে চরম ব্যক্তিগত লড়াই, দুর্ঘটনা বা চোট সামলেও ক্যামেরার সামনে তাঁর অবিচল নিষ্ঠা টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁকে এক লড়াকু ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সম্প্রতি একটি খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তিনি বিনোদন দুনিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি ও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উতরাই নিয়ে কিছু বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
বর্তমানের ডিজিটাল যুগে অভিনয় জগতে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া রিলে কতখানি প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে অভিনেত্রী তাঁর স্পষ্ট মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান ট্রেন্ড অনুযায়ী অনেকেই মনে করেন ভালো রিলস বানাতে না জানলে হয়তো ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকা বা কাজ পাওয়া মুশকিল। কিন্তু স্বর্ণকমল জোর দিয়ে বলেন, স্রেফ ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে রিল বানিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার চেয়ে একজন প্রকৃত শিল্পীর কাছে তাঁর অভিনয় যোগ্যতা ও পেশাদারিত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রিলস বানানো বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকাটা কারো ব্যক্তিগত পছন্দ হতে পারে, কিন্তু সেটাই কাজ পাওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। পরিচালকদেরও উচিত রিলসের ভিউ না দেখে প্রকৃত মেধা ও চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতাদের সুযোগ দেওয়া।
আরও পড়ুন: উজিকে ধাক্কা মেরে বের করে দিল নিশা! আদালত থেকে বের হতেই মহারানীর নতুন পরিকল্পনা! কার সাথে হাত মেলালো নিশা? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের লবিং, স্বজনপোষণ এবং কাজের পরিবেশ নিয়েও অভিনেত্রী বেশ কিছু গুরুতর ও বিস্ফোরক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানান যে, বিনোদন জগতে টিকে থাকতে গেলে অনেক সময়ই নানা রকমের কম্প্রোমাইজ করার মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা নতুন বা বহুদিনের পরিশ্রমী শিল্পীদের মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়। ইন্ডাস্ট্রির কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বা পরিচালক-প্রযোজকদের ঘিরে তৈরি হওয়া বলয় এবং কাজের ক্ষেত্রে ‘বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু’ হওয়ার অলিখিত চাহিদার মতো নেতিবাচক দিকগুলো নিয়েও তিনি সরব হয়েছেন। তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর কাজ পাওয়ার পেছনে তাঁর প্রতিভা ও পরিচালকের সঙ্গে কাজের প্রতি দায়বদ্ধতাই প্রধান হওয়া উচিত, কোনো ধরণের অনৈতিক সমঝোতা নয়।
নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বর্ণকমল তাঁর জীবনের এক কঠিন সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের এক যন্ত্রণাদায়ক ও দুর্বিষহ বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা কাটিয়ে তিনি আজ একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে নিজের মেয়েকে বড় করে তুলছেন। অতীতে শ্বশুরবাড়ির মানসিক ও সামাজিক অত্যাচার এবং তীব্র একাকীত্বের শিকার হয়েও তিনি যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক। তিনি জানান, পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, নিজের আত্মবিশ্বাস এবং সততাকে বিসর্জন না দিয়ে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়াটাই আসল। আজ একজন স্বাধীন নারী ও মা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি বিনোদন জগতেও মাথা উঁচু করে নিজের কাজ বজায় রাখছেন।
অভিনেত্রীর কাজের প্রতি গভীর নিষ্ঠা এবং বর্তমান প্রজন্মের জন্য তাঁর মূল্যবান বার্তাটি ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি এক ভয়াবহ ঘরোয়া দুর্ঘটনার কবলে পড়ে দু’হাতে ১৮টি সেলাই নিয়েও তিনি যেভাবে ধারাবাহিকের শুটিং চালিয়ে গেছেন, তা তাঁর পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের উদ্দেশ্যে তিনি বার্তা দিয়েছেন যে, কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার গ্ল্যামার বা সস্তা প্রচারের পেছনে না ছুটে কাজের প্রতি সৎ ও আত্মবিশ্বাসী হওয়া জরুরি। জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতি বা দুর্ঘটনাও যে মানুষের ইচ্ছাশক্তির সামনে হার মানতে বাধ্য, স্বর্ণকমল দত্তের জীবনের গল্প এবং তাঁর এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারটি যেন সেই সত্যকেই আরও একবার প্রমাণ করে।

