গ্ল্যামারাস ইমেজ ছেড়ে এক লহমায় বুড়ি ‘পিসিমা’! এপার-ওপার বাংলার অপরিসীম ভালোবাসাই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি! ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’র স্মৃতিচারণে আবেগপ্রবণ মৌমিতা চক্রবর্তী!

মৌমিতা চক্রবর্তী (Moumita Chakraborty) বাংলা বিনোদন জগতের এক অত্যন্ত পরিচিত, প্রতিভাবান এবং শ্রদ্ধেয় নাম। ১৯৯৪ সালে গ্ল্যামারাস মডেলিংয়ের দুনিয়ায় পা রেখে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়েছিল। এরপর ১৯৯৫ সালে ছোটপর্দার ধারাবাহিক দিয়ে অভিনয় জগতে তাঁর প্রথম প্রবেশ। তবে তিনি আপামর বাঙালি দর্শকের কাছে প্রকৃত পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পান বাংলা চলচ্চিত্রের রূপালী পর্দার হাত ধরে। ২০০৪ সাল পর্যন্ত রূপালী পর্দায় একের পর এক চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে অভিনয় করে তিনি জয় করে নিয়েছিলেন দর্শকদের অফুরন্ত ভালোবাসা ও আশীর্বাদ।
সময়ের সাথে সাথে নিজেকে নতুন মাধ্যমে মেলে ধরতে ২০০৫ সালে অভিনেত্রী হিসেবে যাত্রা মঞ্চে তাঁর এক নতুন পথচলা শুরু হয়। যাত্রা আজও বাংলার গ্রামীণ ও মফস্বল সংস্কৃতির অসংখ্য মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান এবং জীবন্ত মাধ্যম। এই সময়কালে যাত্রার পাশাপাশি বেশ কিছু চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকে তিনি অভিনয় করলেও, যাত্রামঞ্চই হয়ে উঠেছিল তাঁর অভিনয় জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ২০১২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশক অত্যন্ত সফলতার সাথে যাত্রাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছিল তাঁর গোটা ক্যারিয়ার।
ইতিমধ্যে বাংলা টেলিভিশনের ধারাবাহিকগুলো বাঙালি ড্রয়িংরুম ও দর্শকদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। ধারাবাহিকের বিভিন্ন চরিত্র, তাদের গল্প, সাজপোশাক ও ব্যক্তিত্ব মানুষের ঘরে ঘরে নিত্যদিনের আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। একজন জাত অভিনেত্রী হিসেবে এই শক্তিশালী ও গতিশীল মাধ্যমে কাজ করার এবং নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার এক প্রবল ক্ষিদে তৈরি হচ্ছিল তাঁর মনে।
অবশেষে ২০১৩ সালে শুরু হয় তাঁর অভিনয় জীবনের এক দুর্দান্ত ‘দ্বিতীয় ইনিংস’। এসভিএফ প্রযোজিত এবং স্টার জলসা-র ব্লকবাস্টার ধারাবাহিক ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’-র মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ বিরতির পর আবার টেলিভিশনের পর্দায় কামব্যাক করেন। দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র ও যাত্রায় মূল নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করার পর, হঠাৎ নিজের বাস্তবের বয়সের তুলনায় অনেক বড় একটি চরিত্রে অভিনয় করা প্রথমদিকে তাঁর কাছে মোটেও সহজ ছিল না। নিজেকে সেই ম্যাচিউর চরিত্রে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং দর্শকের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা ছিল এক কঠিন মানসিক লড়াই।
আরও পড়ুনঃ ‘টেলিভিশন এখন শুধুই একটা যন্ত্র, হারিয়ে গেছে সেই…!’ ‘কিছু করতে না পেরে অনেকেই নেতা হয়ে যাচ্ছেন!’ কাদের উদ্দেশ্য করে এমন কথা বললেন অভিনেত্রী? টলিউডের অন্দরে নোংরা রাজনীতি নিয়ে অকপটে কাঞ্চনা মৈত্র!
কিন্তু একজন প্রকৃত অভিনেত্রীর প্রতিভা কখনো চাপা থাকে না। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অভিনীত ‘পাখির পিসি’ চরিত্রটি দর্শকদের হৃদয়ে এক স্থায়ী ও চিরন্তন জায়গা করে নেয়। মানুষের এই অকুণ্ঠ ভালোবাসাই তাঁর মনের সমস্ত দ্বিধা, সংকোচ ও মানসিক লড়াইয়ের অবসান ঘটায়। তিনি নতুন করে উপলব্ধি করেন যে, দর্শক শুধু রূপালী পর্দার গ্ল্যামারাস নায়িকা মৌমিতাকে নয়, বরং জাত অভিনেত্রী মৌমিতাকেও মনেপ্রাণে আপন করে নিয়েছেন। এই দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতে যিনি তাঁর ওপর প্রথম ভরসা রেখেছিলেন এবং এত সুন্দর একটি চরিত্রে তাঁকে কাস্ট করেছিলেন, সেই পুনম ঝা-র প্রতি তিনি আজও আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আজ এত বছর পরেও এপার বাংলা ও ওপার বাংলার দর্শকদের কাছ থেকে ‘পাখির পিসি’ চরিত্রের জন্য যে অফুরন্ত স্নেহ ও ভালোবাসা তিনি পান, একজন শিল্পীর জীবনে তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না।

