‘অভিনয় করার যোগ্যতা নেই আমার!’ ‘প্রয়োজন হলে রুটির দোকান দেব, তবু দালালি করব না!’—অভিনয় জগতকে বিদায় জানিয়ে বি’স্ফোরক অভিনেত্রী গুলশানা!

টলিউড (Tollywood) অভিনয় জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ গুলশানা (Gulshana)। ছোট পর্দা থেকে শুরু করে বড় পর্দা এবং থিয়েটারের মঞ্চ সব মাধ্যমেই তিনি নিজের সাবলীল অভিনয়ের ছাপ রেখেছেন। ‘কনে দেখা আলো’, ফুলকি-এর মতো ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ধরণের চরিত্রে নিজেকে ভেঙে গড়েছেন তিনি। একজন নিষ্ঠাবান শিল্পী হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর যথেষ্ট কদর থাকলেও, পর্দার পেছনের মানুষটি যে দীর্ঘ সময় ধরে এক গভীর মানসিক ও পেশাদার টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, তা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি।
বর্তমানে অভিনয় জগত থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন গুলশানা। তাঁর মতে, গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে তিনি এক তীব্র আত্মসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন যেখানে তাঁর মনে হচ্ছে বর্তমান অভিনয় জগতের তথাকথিত ‘ইঁদুর দৌড়ে’ টিকে থাকার যোগ্যতা তাঁর নেই। তিনি মনে করেন, আজকের দিনে টিকে থাকতে গেলে শুধুমাত্র অভিনয়ের দক্ষতাটুকুই যথেষ্ট নয়, বরং তার বাইরেও এমন অনেক কিছু করতে হয় যা তাঁর ব্যক্তিত্বের সাথে মানানসই নয়। নিজের আদর্শ এবং যাপনের সাথে আপস না করে এই গ্ল্যামার জগত থেকে সসম্মানে বিদায় নেওয়াকেই তিনি শ্রেয় বলে মনে করছেন।
পেশাদারী জীবনের পাশাপাশি গুলশানা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কেও অকপটে মুখ খুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতার শিকার। কোভিডের সময় থেকেই এই সমস্যার শুরু, যা একসময় মেলানকোলিয়া ডিসঅর্ডারের রূপ নেয়। মাসের পর মাস বিছানা ছেড়ে ওঠার শক্তিটুকুও পেতেন না তিনি। সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জানিয়েছেন যে মানসিক রোগ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি শারীরিক ও রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা। সমাজের মানুষের কাছে তাঁর অনুরোধ, কেউ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলে তাঁকে ভুল না বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে সাহায্য করা উচিত।
টলিউডের বর্তমান কাজের পরিবেশ এবং পিআর (PR) সংস্কৃতির প্রতিও ক্ষোভ ও অভিমান প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে কাজের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে ফলোয়ারের সংখ্যা বা ক্রমাগত নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরণের কৃত্রিমতা তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর কাজ কথা বলা উচিত তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে, রিলস বা প্রচারের মাধ্যমে নয়। ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রাপ্য সম্মান এবং ভালো কাজের অভাবই তাঁকে আজ এই চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে রুটির দোকান দেবেন, কিন্তু নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কাজ করবেন না।
আরও পড়ুনঃ সাধুবাবার চক্রান্তে বিপদে দিতি-গোরা! জঙ্গলের অন্ধকারে কি নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পারবে তারা?দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে গুলশানার এক অন্য রূপ ফুটে ওঠে, যেখানে তিনি তাঁর পশুপ্রেম এবং মানবিকতার কথা তুলে ধরেন। মানুষের চেয়ে রাস্তার অবলা পশুদের কষ্ট তাঁকে বেশি বিচলিত করে। বর্তমানের এই তীব্র দাবদাহে রাস্তার কুকুর-বেড়ালের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার এবং তাদের জন্য জল ও খাবারের ব্যবস্থা করার আকুল আবেদন জানিয়েছেন তিনি। অভিনয়ের ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে তিনি এখন বই পড়া, লেখালেখি এবং ঘরোয়া হাতের কাজের মধ্যেই শান্তি খুঁজছেন। এই দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষে এটি স্পষ্ট যে, গুলশানা খাতুন কেবল একজন অভিনেত্রী নন, বরং এক সংবেদনশীল ও প্রতিবাদী সত্তা যিনি স্রোতে গা না ভাসিয়ে নিজের শর্তে বাঁচতে চান।

