‘সবকিছু সস্তা কনটেন্ট নয়!’ ‘অরিজিতের মাত্র ১০-১৫% প্রতিভা…’ বিস্ফোরক গায়িকা অন্তরা মিত্র!

আজকের ডিজিটাল যুগে যেখানে ‘ভাইরাল’ হওয়াটাই শেষ কথা, সেখানে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন সুর শোনা গেল বলিউড ও টলিউডের জনপ্রিয় বাঙালি গায়িকা অন্তরা মিত্রের (Antara Mitra) গলায়। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘স্ট্রেট আপ উইথ শ্রী’-র ৯৬তম পর্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে নিজের জীবন, সঙ্গীত ভাবনা এবং ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহল নিয়ে এক দীর্ঘ ও অকপট আড্ডায় মাতলেন তিনি। আলোচনার শুরুতেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, জীবনের সব কিছুকে সস্তা ‘কনটেন্ট’ হিসেবে বিচার করা ভুল। একজন শিল্পীর সারাজীবনের কঠোর সাধনা ও অধ্যাবসায়কে স্রেফ একটি লাইনের কনটেন্ট বানিয়ে দেওয়া যায় না। বিনোদন জগতের চাকচিক্যের পেছনে যে কতখানি মানসিক লড়াই জড়িয়ে থাকে, এই পডকাস্টে তারই এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন অন্তরা।

সংগীতের পরিমণ্ডলে বড় হলেও গানকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কোনো পূর্বপরিকল্পনা অন্তরার ছিল না। পডকাস্টে নিজের ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে গিয়ে গায়িকা জানান, তাঁর বাবা গান শেখাতেন বলে ঘরে সারাক্ষণই সুরের আনাগোনা ছিল। তবে একসময় বাকি পাঁচটা সাধারণ পরিবারের মতোই পড়াশোনাকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে তিনি গান গাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী অন্তরার লক্ষ্য ছিল মেডিকেল এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়া। কিন্তু পরবর্তীতে জীবনের মোড় ঘোরে এবং তিনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে কলেজ জীবন শুরু করেন। অতীতে বোর্ড এক্সামের চাপের কারণে গান বন্ধ করাকে এখন ‘বোকা বোকা’ সিদ্ধান্ত মনে করেন অন্তরা। তাঁর মতে, আমরা যদি কঠিন সময়ে খাওয়া কিংবা ঘুমানো না ভুলি, তবে স্রেফ পরীক্ষার দোহাই দিয়ে জীবন থেকে এক ঘণ্টার জন্য গান বা রেওয়াজ কেন বাদ দেব?

এই মিউজিক্যাল আড্ডায় অন্তরার সমসাময়িক এবং অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ভারতীয় সংগীত জগতের অন্যতম নক্ষত্র অরিজিৎ সিংয়ের প্রসঙ্গটি এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। অরিজিতের অসামান্য প্রতিভা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অন্তরা একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সাধারণ শ্রোতারা বা পৃথিবী এখন পর্যন্ত অরিজিৎ সিংয়ের মিউজিশিয়ানশিপ বা সংগীত প্রতিভার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ দেখতে পেয়েছে, বাকিটা এখনো অনাবিষ্কৃত। অরিজিৎ যে কাজের মাঝে মাঝে একটা বড় বিরতি বা ‘ব্রেক’ নেন, সেটিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে অন্তরা আশা প্রকাশ করেন যে, এই বিরতিগুলোর মাধ্যমেই অরিজিতের সংগীতের অন্যান্য দুর্দান্ত এবং অপ্রকাশিত দিকগুলো ভবিষ্যতে শ্রোতাদের সামনে উন্মোচিত হবে।

গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের এক অন্ধকার দিক অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে সবসময় নিজেকে নিখুঁত ও সুন্দর দেখানোর যে সামাজিক ও মানসিক চাপ, তা নিয়েও গায়িকা অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা করেন। তিনি জানান, তারকাদের ওপর সবসময় একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে ধরে রাখার অবিরত চাপ থাকে। যদি কোনো শিল্পী বা বিনোদন জগতের কর্মী নিজেকে এই বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে সঁপে দেন, তবে সেই গ্ল্যামারের ক্ষুধা একসময় তাঁর ভেতরের আসল মানুষটাকেই গ্রাস বা ‘কনজিম’ করে নেয়। এই সর্বগ্রাসী মানসিক চাপ থেকে নিজেকে দূরে রেখে, স্রেফ নিজের কাজ এবং সুরের প্রতি সৎ থাকাই অন্তরার জীবনের অন্যতম বড় মূলমন্ত্র, যা তাঁকে খ্যাতির অন্ধ দৌড় থেকে মুক্ত রেখেছে।

আরও পড়ুনঃ ‘রাত হলে অভিনেত্রীদের বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে!’ গঙ্গার জল ছিটিয়ে স্টুডিয়োয় প্রবেশ করে পাপিয়ার বড় ঘোষণা! ‘টলিউডে আর থাকবে না দাদাগিরি’!

বাঙালি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ছোঁয়ায় মোড়ানো এই পডকাস্টের শেষ পর্বটি ছিল দর্শকদের জন্য এক পরম প্রাপ্তি। এদিনের আড্ডায় অন্তরাকে তাঁর শাশুড়ি মায়ের উপহার দেওয়া একটি চমৎকার ঐতিহ্যবাহী বালুচরি শাড়িতে অপরূপ দেখচ্ছিল, যা সঞ্চালক ও দর্শকদের বিশেষভাবে নজর কাড়ে। দীর্ঘ আড্ডার মধুর সমাপ্তি ঘটে সুরের মূর্ছনায়। সঞ্চালকের বিশেষ অনুরোধে অন্তরা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় হিন্দি গান ‘গেরুয়া’ (শাহরুখ খান ও কাজল অভিনীত ‘দিলওয়ালে’ ছবির গান)-র কয়েকটি লাইন খালি গলায় গেয়ে শোনান। বসন্তের আবহে অন্তরার কণ্ঠের সেই জাদুকরী সুর স্টুডিওর পরিবেশকে এক মায়াবী রূপ দেয়, যা প্রমাণ করে দেয় যে খ্যাতির পেছনে না ছুটলেও, খাঁটি প্রতিভা নিজের জোরেই মানুষের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেয়।

Back to top button